বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায় ঘোষণাকে ঘিরে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিচ্ছেন নেতারা। দুই দলের নেতারা একে-অন্যকে পাল্টা হুঁশিয়ারিও দিচ্ছেন। গত দুইদিন ধরে রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ থেকে এ ধরনের বক্তব্য আসছে। বিএনপি নেতারা বলছেন, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে যেনতেন রায় এলে দেশবাসী তা মেনে নেবে না। আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন, আদালতের ওপর সরকারের কোনো হস্তক্ষেপ নেই। রায়কে ঘিরে বিএনপি কোনো নাশকতা করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এর জবাব দেবে।

জনগণের জানমালের নিরাপত্তায় আওয়ামী লীগ প্রয়োজনে মাঠে থাকবে
বলেও জানিয়েছেন নেতারা।
আদালতের স্বাধীনতায় সরকারের কোনো হস্তক্ষেপ নেই: সেতুমন্ত্রী
স্টাফ রিপোর্টার, সাভার থেকে জানান, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বাংলাদেশের আদালত স্বাধীনভাবে দায়িত্বপালন করছেন সরকার কোনো হস্তক্ষেপ করছে না। যার প্রমাণ সরকারের অনেক মন্ত্রী এমপি ও ছাত্রলীগের অনেক নেতাকর্মীও কারাগারে রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। গতকাল দুপুরে সাভারের হেমায়েতপুরে, হেমায়েতপুর-মানিকগঞ্জ- সিংগাইর আঞ্চলিক সড়কের উন্নয়ন কাজ উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মন্ত্রী এ কথা বলেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এ সময় আরো বলেন, যদি আদালত স্বাধীন না হতো তাহলে খুনের মামলায় আওয়ামী লীগের এমপি কারাগারে থাকত না। আদালতের স্বাধীনতায় সরকারের কোনো হস্তক্ষেপ নেই, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার দুর্নীতির মামলার কী সাজা হবে এটা আদালতের এখতিয়ার। সাক্ষ্য প্রমাণ ও তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত সিদ্ধান্ত নেবে এখানে সরকারের কোনো হাত নেই। আদালত কী রায় দেবে সেটাতো আদালতের বিষয়। আদালতের রায়ও বিএনপি মানে না। তারা কার বিরুদ্ধে আন্দোলনের হুমকি দিচ্ছে। আদালতের বিরুদ্ধে যারা হুমকি দিতে পারে আমরা মনে করি তাদের হাতে দেশ, গণতন্ত্র ও বিচার ব্যবস্থা কোনোটাই নিরাপদ নয়। নির্বাচনের আগেই বিএনপি নির্বাচনে জিততে চায়। ২০১৩/১৪ সালের মতো নির্বাচনের নামে বিএনপি যদি জ্বালাও পোড়াও করতে চায় তাহলে জনগণই তাদের প্রতিহত করবে। আওয়ামী লীগে কোনো অনুপ্রবেশকারী নেই জানিয়ে মন্ত্রী বলেন আগামী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দল ও দেশের কাছে যে ব্যক্তি গ্রহণযোগ্য তাকেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়া হবে। সংসদ নির্বাচনে তিন মাস পর পর জরিপ হচ্ছে যে ব্যক্তি জরিপে এগিয়ে থাকবে তাকেই মনোনয়ন দেয়া হবে। মন্ত্রীর সঙ্গে এসময় উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ডা. এনামুর রহমান, সাভার উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল আলম রাজীব, তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফখরুল আলম সমরসহ সড়ক ও জনপথ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
যেনতেন রায় দেশের মানুষ মানবে না: ফখরুল
স্টাফ রিপোর্টার জানান, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে যেনতেন রায় দিলে দেশবাসী তা মেনে নেবে না বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, এত সোজা নয়- খালেদা জিয়াকে আপনারা যেনতেন প্রকারে একটা রায় দেয়ার ব্যবস্থা করবেন, আর দেশের মানুষ সেটা মেনে নেবে। সঠিক বিচার করতে হবে, ন্যায়বিচার হতে হবে। যেনতেন কোনো রায় দেশের মানুষ মেনে নেবে না। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক দল আয়োজিত এক প্রতিবাদ সভায় তিনি এ হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েল ও সাংগঠনিক সম্পাদক ইয়াসিন আলীর মুক্তির দাবিতে এই সভার আয়োজন করা হয়। মির্জা আলমগীর বলেন, পরিষ্কার বলতে চাই, আমাদের নেত্রী এদেশের ১৬ কোটি মানুষের আশা-ভরসার স্থল, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের একমাত্র প্রতীক, যার দিকে তাকিয়ে আছে সারা বাংলাদেশ। সরকার তাকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে চায়। আমরা কী সেটা করতে দেব? এ সময় উপস্থিত নেতাকর্মীরা সমস্বরে ‘না’, ‘না’ বলে জবাব দেন। নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বিএনপি মহাসচিব বলেন, আপনারা কি সমস্ত জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে তার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন? নেতাকর্মীরা ফের সমস্বরে ‘হ্যাঁ’, ‘হ্যাঁ’ বলে জবাব দেন। মির্জা আলমগীর বলেন, দেশের সমস্ত অর্জনকে ধ্বংস করে দিয়ে আওয়ামী লীগ মিথ্যাচারের ওপর টিকে আছে। তারা এখন দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখার চক্রান্ত করছে। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলার কোনো সত্যতা নেই। আদালতে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জাল নথি উপস্থাপন করেছে প্রসিকিউশন। আমাদের আইনজীবীদের পুরো কথা কেউ শোনেনি। আইনজীবীদের কোনো রকম সুযোগ না দিয়ে, সিনিয়র আইনজীবীদের গিলোটিন করে তাদের বক্তব্য শেষ ও রায়ের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। কারণ রায় আগেই নির্ধারণ করে রাখা হয়েছে। মির্জা আলমগীর প্রশ্ন রেখে বলেন, মামলায় এত তাড়াহুড়ো কেন? আইনের একটি স্বাভাবিক গতি, মামলার স্বাভাবিক গতির বাইরে গিয়ে জোর করে অতি দ্রুততার সঙ্গে কেন এই রায় দেয়ার চেষ্টা? একটাই কারণ- বিএনপি ও খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখার ষড়যন্ত্র। তিনি বলেন, সরকারের মন্ত্রীরা বলেছেন- আটদিনের মধ্যে রায় হবে, ১৫ দিনের মধ্যে রায় হবে। যখন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছিলেন ১৫ দিনের মধ্যে রায় হয়ে যাবে। প্রতিমন্ত্রী রাঙ্গা বলেছিলেন আটদিনের মধ্যে হয়ে যাবে। তখন দেখা গেল ফেব্রুয়ারির ৮ তারিখ রায় ঘোষণার কথা বলা হলো। খালেদা জিয়ার মামলার রায় ঘোষণা নিয়ে সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের বিভিন্ন ধরনের বক্তব্যে পরিষ্কার যে, এ মামলার রায় আগে থেকেই নির্ধারিত। প্রহসনের এ বিচারের কোনো প্রয়োজন ছিল না। রায় নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি প্রসঙ্গে মির্জা আলমগীর বলেন, আওয়ামী লীগের মন্ত্রীরা হুঙ্কার দিচ্ছেন, হুমকি দিচ্ছেন। রায়ের পরে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করলে কঠোর হাতে দমন করা হবে। আপনাদের মাথায় এটা এলো কেন? আমরা তো দেখছি, এই মামলায় কিছুই নেই, কোনো সত্যতা নেই, প্রসিকিউশন কিছু প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাহলে আপনারা হঠাৎ করে এটার (বিশৃঙ্খলা) কথা ভাবছেন কেন? বিএনপি মহাসচিব বলেন, এ মিথ্যা মামলাকে ঘিরে খালেদা জিয়ার সঙ্গে যে অসম্মান ও অসদাচরণ করা হচ্ছে সেটাও নজিরবিহীন। মির্জা আলমগীর বলেন, স্পষ্ট করে বলছি- খালেদা জিয়া উড়ে এসে জুড়ে বসেননি। তিনি দীর্ঘ ৯ বছর রাজপথে স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন, প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, বিরোধী দলের নেত্রী হয়েছেন। তাই তার সঙ্গে এ ধরনের আচরণের জন্য আওয়ামী লীগ সরকারকে জাতি কোনোদিন ক্ষমা করবে না। বিএনপি মহাসচিব বলেন, সারা দেশে গত একমাসেই সাড়ে ১২ হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছেন বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় নেতা। শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় আসার পর সুপরিকল্পিতভাবে দমন-পীড়ন চলছেই। আমাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়েছে ৫০ হাজারের ওপর মামলা। চেয়ারপারসন থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রত্যেকের নামে অন্তত ১০টি করে মামলা আছে। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এস এম জিলানীর সভাপতিত্বে সভায় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু, সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন, মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল বাশার ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শফিউল বারী বাবু বক্তব্য দেন।
রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা: রিজভী
স্টাফ রিপোর্টার, কুড়িগ্রাম থেকে জানান, ‘বিচার আইনি প্রক্রিয়ায় চলছে না, এটা আওয়ামী প্রক্রিয়ায় তারা নেয়ার চেষ্টা করছে। ন্যায় বিচার হলে সব অভিযোগ থেকে খালেদা জিয়া মুক্ত হবেন।’ গতকাল কুড়িগ্রামের বেলগাছা ইউনিয়নে জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে কম্বল বিতরণকালে খালেদা জিয়ার বিচার কার্যক্রম নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন- বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী। তিনি আরো বলেন, ক্ষমতাসীনদের ইন্ধনে ক্যামেরা ট্রায়াল বা গায়েবি নির্দেশের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত আসলে বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোট তা রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করবে। ভোটারবিহীন সরকার তাদের নিজেদের নামে সাড়ে ৭ হাজার মামলা প্রত্যাহার করেছেন কিন্তু বিএনপির কোনো নেতাকর্মীর মামলা প্রত্যাহার করেননি ।
অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পর্কে বলেন, ঘুঘু একবার ধান খেয়ে যেতে পারে, বার বার পারে না। প্রধানমন্ত্রী নিয়মরক্ষার নির্বাচনের কথা বলে প্রতারণা করেছেন। ৮ই ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার মামলার রায় নিয়ে বিএনপিকে ধমক দেয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করে রিজভী আহমেদ বলেন, মামলার রায়ের পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে। জনবিচ্ছিন্ন এ সরকার খালেদা জিয়ার মামলা নিয়ে যতই কৌশল করুক তা সফল হবে না। তাকে শুধুমাত্র হয়রানি করার জন্য জাল নথি ও ভুয়া তথ্য দিয়ে এ মামলা সাজানো হয়েছে। যদি ন্যায় বিচার ও সঠিক বিচার হয় তাহলে বেগম জিয়া সব অভিযোগ থেকে মুক্তি পাবেন। কিন্তু মামলার রায়ে কোনো গায়েবি নির্দেশ আসলে বিএনপি তা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে মোকাবিলা করবে।
তিনি গতকাল দুপুরে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার বেলগাছা ইউনিয়নের বসুনিয়ারহাট বাজার সংলগ্ন আউলিয়াপুর হাফিজিয়া মাদরাসা মাঠে জিয়াউর রহমানের ৮২তম জন্মদিন উপলক্ষে শীতার্তদের মাঝে ছয় শতাধিক কম্বল বিতরণ অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল, সহ: আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক বেবী নাজমিন, জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ডা. ফরহাদ হালিম, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান রানা, সহ-সভাপতি আবু বকর, মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা, শফিকুল ইসলাম বেবু, আব্দুল আজিজ, যুগ্ম সম্পাদক সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ, হাসিবুর রহমান হাসিব, সাংগঠনিক সম্পাদক নুর ইসলাম নুরু ও সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাহবুবুর রহমান প্রমুখ।

আরও পড়ুনঃ   গোপন বৈঠকের সময় জামায়াত নেতাসহ আটক ৬

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

two + 6 =