আবু তাহের, কক্সবাজার অফিস:

মিয়ানমারের রাখাইনে প্রাদেশিক রাজধানী সিতওয়ে (সাবেক আকিয়াব) শহরসহ আশপাশের ২৯টি ক্যাল্ফেপ আশ্রিত দেড় লাখ রোহিঙ্গাকে এবার বাংলাদেশে ঠেলে পাঠাচ্ছে মিয়ানমার। ২০১২ সালের জুন মাসে জাতিগত দাঙ্গার পর অভ্যন্তরীণ বাস্তুচু্যত মানুষ (আইডিপি) হিসেবে এই রোহিঙ্গাদের আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গারা জানিয়েছে, আকিয়াবের বিভিম্ন ক্যাল্ফেপ গত পাঁচ বছর ধরে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে চলে যাওয়ার জন্য সেনাবাহিনী এবং স্থানীয় রাখাইন সম্প্রদায়ের লোকজন হুমকি দিচ্ছে। ফলে অনেকেই এখন ক্যাল্ফপ ছেড়ে সমুদ্রপথে বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে। অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গারা জানায়, নৌকায় করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে মিয়ানমার পুলিশ ও নৌবাহিনী তাদের বাধা দেয় না; বরং সহযোগিতা করে থাকে।

কক্সবাজারে জাতিসংঘের উদ্বাস্তুবিষয়ক হাইকমিশন ইউএনএইচসিআরের তথ্যমতে, রাখাইনে ২০১২ সালে জাতিগত দাঙ্গার পর এক লাখ ৪৬ হাজার রোহিঙ্গা সিতওয়ে এবং আশপাশের ২৯টি ক্যাল্ফেপ আশ্রিত হিসেবে থাকে। এর মধ্যে সিতওয়ে শহরের বাইরে ১৫ ক্যাল্ফেপ রয়েছে প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গা। রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হলে প্রথমে তাদের নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ক্যাল্ফেপ রাখা হলেও পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলেও বাড়িঘরে ফিরতে দেওয়া হয়নি। আন্তর্জাতিক কয়েকটি এনজিও সংস্থা ক্যাল্ফেপ আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মানবিক সাহায্য-সহযোগিতা দিয়ে এলেও গত ২৫ আগস্টের পর সেখানে কর্মরত এনজিও কর্মীদের নিরাপত্তার অজুহাতে রাখাইন থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফলে ক্যাল্ফেপ আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় ক্যাল্ফপ ছেড়ে তারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে শুরু করেছে।

উখিয়ার মনখালী উপকূলে শনিবার সকালে দেখা হয় অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গা আবদুল আলীর (৪৩) সঙ্গে। পরিবারের সাত সদস্য নিয়ে শনিবার ভোররাতে নৌকায় চড়ে তিনি বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন। ওই রোহিঙ্গা জানান, ২০১২ সালের দাঙ্গায় রাচিদংয়ে তাদের পাড়াটি পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর তাদের কাউকপাও এলাকায় একটি আশ্রয় ক্যাল্ফেপ রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে অনেকবার বাড়ি-ভিটায় ফিরে যেতে চেয়েছি। কিন্তু মিলিটারি পুলিশ যেতে দেয়নি। গত পাঁচ বছর ধরে ক্যাল্ফেপ অনাহারে-অর্ধাহারে চরম কষ্টের মধ্যে কাটিয়েছি। এখন সেখানে থাকতে দেবে না। বাংলাদেশে চলে যাওয়ার হুমকি দিচ্ছে মিলিটারি এবং তাদের সাহায্যকারী কিছু লোকজন।

আকিয়াব শহরের কাছে রামরি রোহিঙ্গা ক্যাল্ফপ থেকে পালিয়ে এসেছেন হামিদ হোসেন (৪৫)। তিনি জানান, গত পাঁচ বছর ধরে পরিবারের আট সদস্য নিয়ে ক্যাল্ফেপ কাটিয়েছেন। জাতিসংঘের একটি সংস্থা তাদের কিছু সাহায্য-সহযোগিতা দিয়ে আসছিল। এখন তারা ক্যাম্প থেকে চলে গেছেন। অনাহারে মারা যাওয়ার চেয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে পেরে খুশি এই রোহিঙ্গা। যারা রয়েছে তারাও আসার অপেক্ষায় আছে।

হামিদ হোসেন জানান, গত ৪-৫ দিন আগে মিলিটারিরা ক্যাল্ফেপ গিয়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে চলে যাওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়ে গেছে।

রাখাইনের বুচিদং বলিপাড়া থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা লাল মিয়া (৪৫) জানান, সেনাবাহিনী তাদের পাড়া পুড়িয়ে দিলে তারা কয়েকদিন জঙ্গলে কাটায়। এর পর হেঁটে সমুদ্রতীরে আসে। একটি নৌকায় উঠে বৃহস্পতিবার রাতে টেকনাফ উপকূলে এসে নেমেছে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের ফেলে আসা বাড়ি-ভিটায় অনেক রাখাইন পরিবারকে পুনর্বাসন করেছে সেনাবাহিনী।

আরসা প্রশ্নে সন্দেহ-দ্বিধাবিভক্তি :আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি আরসা নিয়ে নানা সন্দেহ ও দ্বিধাবিভক্তি রয়েছে রোহিঙ্গাদের মধ্যে। মাস্টার আইয়ুব নামে এক রোহিঙ্গা নেতা বলেন, আরসা হচ্ছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও তাদের মিত্রদের সৃষ্ট গ্রুপ। তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য এই গ্রুপ তৈরি করা হয়েছে। নছর উল্লাহ আরাকানি নামে আরেক রোহিঙ্গা নেতা ইন্টারনেটে পোস্ট দিয়ে আরসার কড়া সমালোচনা করে বলেছে, তাদের কারণে রোহিঙ্গারা আজ বিপদগ্রস্ত। হাজার হাজার রোহিঙ্গা মারা যাচ্ছে এই বিপথগামীদের কারণে।

অন্যদিকে সেলিম উল্লাহ নামে অন্য এক রোহিঙ্গা নেতা দাবি করেছেন, রোহিঙ্গারা বিগত ৭০ বছরে যা করতে পারেনি, আরসা গত কয়েক মাসে তা করেছে। তিনি বলেন, মিয়ানমার কোনো দিন রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দেবে না। তাদেরকেই অধিকার আদায় করে নিতে হবে। আরসাকে তাদের সেই অধিকার আদায়ের বৈধ সংগঠন বলে মনে করেন এই রোহিঙ্গা নেতা। সাধারণ রোহিঙ্গাদের ধৈর্য ধারণ করে আরসাকে সমর্থন দেওয়ার আহ্বান জানান এই রোহিঙ্গা নেতা।

গত ২৫ আগস্ট রাখাইনে ৩০টি পুলিশ ক্যাল্ফেপ হামলার পর সাধারণ অনেক রোহিঙ্গা আরসার পক্ষে অবস্থান নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় প্রতিরোধ বিক্ষোভ করেছিল। সেনাবাহিনীর নির্মম অভিযানের মুখে মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে আরসা নিয়ে তাদের সে ধারণা পাল্টে যায়। যদিও আরসা এক মাসের জন্য একতরফা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছে। তবুও সাধারণ রোহিঙ্গাদের মধ্যে এখন আরসার শক্তি নিয়ে নানা সন্দেহ তৈরি হচ্ছে। সাধারণ রোহিঙ্গারা মনে করছেন, শক্তিশালী কোনো দেশের সমর্থন ছাড়া মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মতো সামর্থ্য আরসা অর্জন করতে সক্ষম হবে না।

রাখাইনে ‘থাব্বে’ :গত বছরের ৯ অক্টোবর রাখাইনে পুলিশ ক্যাল্ফেপ সহিংস হামলার পর ৯০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। গত ২৫ আগস্ট হামলার পর এ পর্যন্ত এসেছে পাঁচ লাখের বেশি রোহিঙ্গা। এর আগে ২০১২ সালে দাঙ্গার পর এসেছে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা। জাতিসংঘের উদ্বাস্তুবিষয়ক সংস্থার তথ্যমতে, ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা এখন বাংলাদেশে অবস্থান নিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে আর কী পরিমাণ রোহিঙ্গা মিয়ানমারে রয়ে গেছে, সমকালের এমন প্রশ্নের উত্তরে ইউএনএইচসিআরের কর্মকর্তা যোসেফ সূর্যমণি বলেন, সঠিক তথ্য না থাকলেও মনে করা হচ্ছে, এখন খুব স্বল্পসংখ্যক রোহিঙ্গা মিয়ানমারে অবস্থান করছে।

অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের কাছে প্রশ্ন করা হলে তারা বলেন, এখন যারা মিয়ানমারে রয়ে গেছে, তাদের বেশিরভাগই ‘থাব্বে’। রোহিঙ্গাদের ভাষায় ‘থাব্বে’ অর্থ হচ্ছে- সেনাবাহিনীর কাছে তথ্য সরবরাহকারী দালাল। অবশ্য ২০১৫ সালের তথ্যমতে, মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১১ লাখ। ইন্টারনেটে তথ্য প্রদানকারী ওয়েবসাইট উইকিপিডিয়াতে রোহিঙ্গাদের এ সংখ্যা উল্লেখ রয়েছে। এই তথ্যমতে বেশিরভাগ রোহিঙ্গা এখন বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে।

স্থলমাইন আতঙ্ক :মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তের শূন্যরেখা ঘেঁষে প্রায় ৭০ কিলোমিটার সীমান্তে হাজার হাজার স্থলমাইন পুঁতে রেখেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। স্থলমাইন বিস্টেম্ফারণে গত এক মাসে ১০ জন নিহত ও ১৩ জন আহত হয়েছেন। ফলে সীমান্ত দিয়ে আতঙ্কে রোহিঙ্গারা এখন আর আসা-যাওয়া করতে পারছে না। এ পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসার জন্য নৌপথকে এখন সুবিধাজনক মনে করছে।

বিশ্বে মাইন নিষিদ্ধ হলেও মিয়ানমার ‘স্থলমাইন নিষিদ্ধকরণ’-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদে সই করেনি।

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

twenty − one =