অবশেষে আলী জোহার নামে একজন রোহিঙ্গাকে পাওয়া গেল। তবে তিনি সেই আলী জোহার নন, সম্প্রতি যে আলী জোহারের ‘আমি রোহিঙ্গা’ নামে একটি কবিতা ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাসুদুজ্জামান। গত ৬ সেপ্টেম্বর থেকে প্রায় বিরতিহীনভাবে কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ায় মিয়ানমার থেকে উদ্বাস্তু হয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আলাপ করার সুবাদে জানা হয়ে গেছে, আলী ও ফাতেমা নাম দুটি তাদের খুব প্রিয়। নাম রাখার ক্ষেত্রে আলী ও ফাতেমার জনপ্রিয়তায় শুরুতে একবার রোহিঙ্গারা শিয়া মুসলিম কি-না এমন সংশয়ও হয়েছিল। পরে অবশ্য জানা হয়েছে, না শিয়া মতাবলম্বীদের কোনো ঠাঁই নেই রোহিঙ্গাদের মধ্যে, নিজেদের তারা সুন্নি বলেই দাবি করে থাকে। সে যাই হোক, আমাদের পথে পাওয়া আলী জোহার এবং খোঁজাখুঁজি করেও না পাওয়া কবি আলী জোহারের কথায় আসা যাক। এই দুই আলীর মধ্যে দুস্তর ব্যবধান রয়েছে। পথে পাওয়া আলী জোহার এসেছেন মংডুর কাওয়ারবিল থেকে। পড়াশোনা নেই বললেই চলে। খুঁজেও যোগাযোগ করতে না পারা আলী জোহার থাকেন ভারতের নয়াদিল্লিতে। ধারণা করা যায়, ইংরেজিতে কবিতা লেখেন তিনি। মাসুদুজ্জামান ইংরেজি থেকেই কবিতাটির অনুবাদ করেছেন। দুই আলীর একটি জায়গায় মিল আছে, তারা দু’জনই শরণার্থী এবং তাদের দু’জনই শেষ পর্যন্ত রোহিঙ্গা বলে পরিচিত হতে চান।

আত্মপরিচয়ের স্বীকৃতি না থাকায় কবি আলী জোহার কী ভাবছেন, তা নিয়ে আমাদের আলাপের সুযোগ হয়নি। তবে কাওয়ারবিলের আলী জোহার বাংলাদেশে আশ্রিত মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে নিবন্ধিত হতে চান না। শেষ পর্যন্ত হয়তো হবেন, না হলে তো ত্রাণ, বাসস্থান ও চিকিৎসাসেবার মতো আশ্রিতের জরুরি সুবিধাটুকুও পাবেন না। এই না চাওয়াটা শুধু আলী জোহারের একার নয়। তাই বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের নিবন্ধন কার্যক্রম এখনও গতি পায়নি। গত শনিবার পর্যন্ত নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ৮২ হাজার ৭৭৭ বলে জানা গেছে। অথচ এরই মধ্যে লাখ ছয়েক হয়ে গেছে এবার বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা।

আলী জোহার তার কবিতায় লিখেছেন, ‘কেউ কেউ মনে করে রাষ্ট্রহীন মানুষ আমি/ কেউ কেউ বলে আমি শরণার্থী/ কেউ কেউ বলে আমি বিদেশী/ কেউ কেউ আবার ঠিকই বুঝতে পারে কে আমি/ কেউ কেউ আমাকে বলে আমি কালো মানুষ/ কোথাও কোথাও আমাকে বলা হয় বাঙালি।’ আসলে কোথাও কোথাও নয়, রোহিঙ্গাদের বাঙালি বলাটা মিয়ানমারের রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই তো পুরোপুরি নাগরিকত্ব হারানোর পরও রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে বাঙালি পরিচয়ে পরিচয়পত্র নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। মিয়ানমারে সরকারিভাবে স্বীকৃত ১৩৫টি নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর তালিকায় রোহিঙ্গাদের স্বীকার করা হয়নি। ১৯৮২ সাল থেকে এই নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে এবং এর ফলে তারা হয়ে পড়েছে রাষ্ট্রহীন মানুষ। পৃথিবীতে যতসংখ্যক রাষ্ট্রহীন নাগরিক আছে, তার মধ্যে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা এক-সপ্তমাংশ। রাষ্ট্র না থাকায় তাদের পাসপোর্ট নেই, ফলে ভিসাও পায় না তারা। মিয়ানমার তাদের বারবার বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে এবং বাংলাদেশও নিতান্ত মানবিক কারণে তাদের আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। ১৯৮২ সালে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বাতিলের আইন হলেও তা বাস্তবায়ন হয় ১৯৯২ সালে। এর আগে ১৯৯০ সালের নির্বাচনেও সংসদে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের চারজন প্রতিনিধি ছিলেন। ১৯৯২ সালে রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। রোহিঙ্গা মুসলিমদের তখন থেকেই বাঙালি হিসেবে এবং হিন্দুদের ভারতীয় হিসেবে পরিচয়পত্র দেওয়া শুরু হয়। হিন্দুদের বেশিরভাগ ভারতীয় হিসেবে পরিচয়পত্র নিলেও মুসলিমদের বেশিরভাগ বাঙালি পরিচয়ে পরিচয়পত্র নিতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে রোহিঙ্গা মুসলিমদের পৃথিবী আটকে যায় নিজ নিজ গ্রামের গণ্ডিতে। তাদের পাশের গ্রামে যেতেও সেনা ও পুলিশ চৌকিতে ঘুষ দিতে হয়। ঘুষ দিতে হয় বনের কাঠ সংগ্রহ করতে গেলেও।

৬ সেপ্টেম্বর থেকে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে শত শত মানুষের সঙ্গে আলাপের সময় তাদের জাতীয়তা কী জানতে চেয়ে সদুত্তর পাওয়া যায়নি। তাদের বেশিরভাগই জাতীয়তা বিষয়টি বুঝতে পারেন না বলে মনে হয়েছে। তবে যখনই তাদের কাউকে তিনি বাঙালি কি-না জিজ্ঞেস করেছি, তিনি তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে উত্তর দিয়েছেন, ‘ন, মুই রুয়িঙ্গা।’ রোহিঙ্গারা নিজেদের সাধারণত ‘রুয়িঙ্গা’ বলে পরিচয় দিয়ে থাকে। বাঙালি কি-না জানতে চাওয়ার পর তাদের প্রতিক্রিয়ায় মনে হয়েছে, রোহিঙ্গারা তাদের বাঙালি বলাটা একটা গালির মতো মনে করে থাকে।

রোহিঙ্গাদের বেশিরভাগ ধর্মে মুসলিম, বেশ কিছু হিন্দু এবং কিছু বৌদ্ধ রোহিঙ্গাও রয়েছে। তারা দ্বাদশ শতাব্দী থেকেই মিয়ানমারে বাস করছে। ১৯৪৮ সালে মিয়ানমারের স্বাধীনতার পর পর পাস হওয়া ইউনিয়ন সিটিজেনশিপ অ্যাক্টে ১৩৫টি জাতিসত্তার মধ্যে রোহিঙ্গারা বাদ পড়ে। অথচ ফ্রান্সিস-বুকাননের জরিপেও রোহিঙ্গাদের উল্লেখ রয়েছে। ফ্রান্সিস বুকানন-হ্যামিলটন ১৭৯৯ থেকে ১৮১৫ সাল পর্যন্ত ভারতে কোম্পানি কর্তৃপক্ষের অধীনে চাকরি করার সময় ব্যাপক জরিপ পরিচালনা করেছিলেন। তার জরিপ প্রতিবেদনে রাখাইন অঞ্চলের ‘রুয়িঙ্গা’ ভাষাভাষী মানুষের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা পাওয়া যায়। অবশ্য ১৮২৪ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ১০০ বছরের বেশি সময়ের ব্রিটিশ শাসনামলে বর্তমানের ভারত ও বাংলাদেশ থেকে অনেক শ্রমিক অভিবাসী হিসেবে সেই সময়কার বার্মায় গিয়েছে। যেহেতু ব্রিটিশরা তখন বার্মাকে ভারতের একটি প্রদেশ হিসেবে শাসন করত, এই অভিবাসনকে অভ্যন্তরীণ অভিবাসন হিসেবেই বিবেচনা করা হতো বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। স্বাধীনতার পর পরই মিয়ানমার সরকার ব্রিটিশ আমলে মিয়ানমারে ঠাঁই গাড়া ভারতীয় ও বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের অভিবাসনকে বেআইনি বলে অভিহিত করে এবং মূলত এই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই তারা বেশিরভাগ রোহিঙ্গাকে নাগরিকত্ব দিতে চায় না বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের প্রতিবেদনে জানায়।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ গত বছর অক্টোবরের পর সম্পাদিত তাদের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে জাতিসত্তা নিয়ে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে মিয়ানমার সরকারের মতভিম্নতাকে এই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ বলে উল্লেখ করেছে। বিশ্বের বিভিম্ন অঞ্চলের যুদ্ধ ও সংঘর্ষ নিরসন এবং প্রতিরোধে কার্যকর বেলজিয়ামের ব্রাসেলসভিত্তিক আন্তর্জাতিক এ গবেষণা সংস্থাটি ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত ‘মিয়ানমার : রাখাইন রাজ্যে নতুন মুসলিম বিদ্রোহ’ শীর্ষক গবেষণার সারসংক্ষেপে বলেছে, রোহিঙ্গারা তাদের রোহিঙ্গা বলে দাবি করছে এবং বলছে, তারা রাখাইনে আছে হাজার বছর ধরে। অন্যদিকে মিয়ানমার বলছে, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে অনুপ্রবেশকারী বাঙালি।

২০১৫ সালে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে রোহিঙ্গাদের কেউ ‘রোহিঙ্গা’ বা ‘বাঙালি’ বলবে না বলে চুক্তি হয়েছিল। সর্বশেষ আনান কমিশনের যে রিপোর্টে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিকত্ব দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে, সেখানেও রোহিঙ্গা শব্দটি পরিহার করা হয়েছে। কিন্তু মিয়ানমার চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করেছে। গত ২৪ আগস্ট রাতে পরিচালিত হামলার দায়িত্ব আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) স্বীকার করে নিলেও মিয়ানমার সরকারিভাবে হামলাকারীদের পরিচয় দিতে বাঙালি কথাটি বারবার ব্যবহার করছে। বাংলাদেশ হয়তো ২০১৫ সালের চুক্তিকে সম্মান জানাতেই রোহিঙ্গারা যখন নিজেদের মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিম হিসেবে নিবন্ধিত করার ইচ্ছা প্রকাশ করছে, তখনও কাগজে-কলমে তাদের ‘মিয়ানমারের নাগরিক’ বলে উল্লেখ করছে।

টেকনাফ ও উখিয়ার রোহিঙ্গা নিবন্ধন কেন্দ্রগুলোতে ঘুরে দেখা যায়, নিবন্ধনের সময় সবার ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের পর ডাটাবেজ করা হচ্ছে। এতে নাম, পিতা-মাতার নাম, পরিবারের সদস্য সংখ্যা, দেশের নাম, মিয়ানমারের স্থায়ী ঠিকানা, ধর্ম, লিঙ্গ, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশার তথ্য থাকে। এসব তথ্য নেওয়ার পর ছবি তোলা হয়। একই সঙ্গে প্রত্যেকের আঙুলের ছাপ নেওয়া হয়। ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর যেভাবে বাংলাদেশি নাগরিকদের বিস্তারিত তথ্য বায়োমেট্রিক নিবন্ধনের মাধ্যমে ডাটাবেজে ধারণ করে, একইভাবে রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক নিবন্ধন শেষ হচ্ছে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন বলেন, আগামী ছয় মাসের মধ্যে রোহিঙ্গা নিবন্ধনের কাজ শেষ করা হবে। তিনি জানান, শুরুতে নিবন্ধনে শ্নথগতি থাকলেও সেনাসদস্যরা যুক্ত হওয়ার পর নিবন্ধনের গতি বেড়েছে। রোহিঙ্গাদের মধ্যেও নিবন্ধনে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।

রাজীব নূর ও আবদুর রহমান, উখিয়া থেকে

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

three − three =