পরিত্যক্ত নৌকাটি যেন শরণার্থীদের জীবনকেই মূর্ত করছিল। যে জীবন তারা পেছনে ফেলে এসেছে, সে জীবনে তাদের নিজেদের ঘর ছিল, গরু ছিল, ছিল চাষের জমি, মাঠে ফসল। এখন যখন সামনে ঘরহীন জীবনের অনিশ্চয়তা, তখন আবার আশ্রয়দাতা রাষ্ট্রের নাগরিকদের নিষ্ঠুরতার শিকার হচ্ছে তারা। সমুদ্র পার করে দেওয়ার বিনিময়ে একদা মানব পাচারের সঙ্গে যুক্ত একটি চক্র রোহিঙ্গাদের সর্বস্ব হাতিয়ে নিচ্ছে।

টেকনাফ থেকে মেরিন ড্রাইভ ধরে .কক্সবাজারের দিকে আট কিলোমিটারের মতো যেতে চোখে পড়ে পরিত্যক্ত ওই নৌকাটি। আগে থেকে খবর পাওয়া গিয়েছিল ৩০ কিলোমিটার দূরের শামলাপুর ঘাটে সাগর পেরিয়ে আসা কিছু রোহিঙ্গা নৌকা ভিড়তে পারে। ওই খবর সংগ্রহের জন্য যাওয়ার পথে পরিত্যক্ত নৌকাটি চোখে পড়ে। বাংলাদেশের মাছ ধরা নৌকার মতো চন্দ্রাকৃতির নয় এটি। রাস্তা থেকেই নকশা দেখে বোঝা যাচ্ছিল এটি মিয়ানমারের নৌকা, সংশয় ছিল ভারতীয় হতেও পারে। তাই সৈকতে নেমে নৌকাটির একেবারে কাছে গেলাম আমরা। নৌকার সামনের দিকে একটি নোঙরের ছবি আঁকা, যেমনটা থাকে মিয়ানমারের নৌকায়। নৌকাটিতে সাদা রঙের ব্যবহার বেশি। পেছনের দিকটা হলুদ। নীলের ব্যবহারও চোখে পড়ল।
এর আগে গত শুক্রবার সকালে শাহপরীর দ্বীপের পশ্চিম উপকূলে এমনই একটি নৌকার দেখা পেয়েছিলাম। তখন নৌকাটি তীরে ভেড়ার চেষ্টা করছিল এবং স্থানীয় বাসিন্দা জসিম মাহমুদ বলেছিলেন, ওটি মিয়ানমারের নৌকা। তিনি আমাদের বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের নৌকায় নকশাগত যে পার্থক্য থাকে তা-ও হাতে-কলমে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন।

যেখানটায় পরিত্যক্ত নৌকাটির দেখা মিলল, তার নাম রাজারছড়া। আশপাশে কোনো মাঝিমাল্লার দেখা পাওয়া গেল না। দুই-তিনটি ছোট ছেলে ছোটাছুটি করছিল, তাদেরই একজন আইউব আলী বলল, এই নৌকা দিয়ে বর্মাইয়ারা (টেকনাফের স্থানীয় লোকজন রোহিঙ্গাদের বর্মাইয়া বলে থাকে) আসছে দুই দিন আগে। তারাই এখানে নৌকাটা তুলে রেখে গেছে। পরে মেরিন ড্রাইভে ফিরে রাস্তার পূর্বদিকের একটি মুদি দোকানে গেলাম, দোকানটি চালায় মোহাম্মদ জায়েদ নামে এক কিশোর। সে সাবরাং মাদ্রাসা থেকে কোরআনে হাফেজ হয়ে এসেছে। তাই নিজেকে হাফেজ মোহাম্মদ জায়েদ বলে পরিচয় দেয়। আমরা যখন তার সঙ্গে কথা বলতে গেলাম তখন দোকানে জায়েদ ছাড়া আর কেউ ছিল না। সে জানায়, নৌকাটি এখানে আছে কয়েকদিন হলো। যে মাঝিরা এই নৌকাটি এখানে রেখেছেন, তারা বলছেন, এটি সমুদ্রে ভেসে যাচ্ছিল বলে তারা তীরে এনে রেখেছেন। তবে জায়েদের অনুমান, কথাটা সত্য বলেননি ওই মাঝিরা। তার ধারণা, এই নৌকায় যে রোহিঙ্গারা এসেছে, তাদের কাছ থেকে পানির দামে তারা নৌকাটি কিনে রেখেছেন। পরে সুবিধামতো সময়ে এটিকে বাংলাদেশের নৌকার মতো করে নেবেন।

মিয়ানমার থেকে উদ্বাস্তু হয়ে আসা শরণার্থীরা এখন পানির দামেই বিক্রি করছে তাদের সঙ্গে আনা নৌকা থেকে গবাদিপশু এবং নারীদের স্বর্ণালঙ্কার। টেকনাফের লামারবাজারের স্বর্ণ ব্যবসায়ী ম্যংকিউ রাখাইন জানালেন, প্রতিদিনই রোহিঙ্গাদের কেউ না কেউ স্বর্ণালঙ্কার বিক্রি করতে আসছে। স্বর্ণকারদের কাছ পর্যন্ত এলে দাম ভালোই পায় তারা। কিন্তু টেকনাফ পেঁৗছার আগেই নৌকার ভাড়া দিতে গিয়ে স্বর্ণালঙ্কার সব খুইয়ে আসছে রোহিঙ্গারা। গত বৃহস্পতিবার থেকে গতকাল বুধবার পর্যন্ত টেকনাফের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আলাপ করে এমন অনেক ঘটনা জানা গেছে। গত শুক্রবার এমনই একজন মংডু শহরের দক্ষিণে দশ কিলোমিটার দূরের একটি গ্রাম কিলাদং থেকে আসা জহির আহমদ জানিয়েছিলেন তার নৌকা বিক্রি করে দেওয়ার কথা। ৮০ বছরের জহির আহমদ একজন অবস্থাপন্ন কৃষক। নিজের নৌকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন তিনি। ফেলে এসেছেন গবাদিপশু, ধান-চালসহ খোরাকির অন্ন। তাই এপাড়ে এসে নৌকাটিই বিক্রি করে দিয়েছেন। পেয়েছেন মাত্র ৩৫ হাজার টাকা। অথচ এই নৌকাটি তৈরি করতে তার লেগেছিল বাংলাদেশের টাকায় প্রায় দেড় লাখ টাকা এবং নৌকাটি তিনি তৈরি করিয়েছিলেন মাস ছয়েক আগে।

নিজের নৌকা আছে, রোহিঙ্গাদের মধ্যে এমন ভাগ্যবানের সংখ্যা খুব বেশি নেই। রোহিঙ্গাদের বেশিরভাগই নিজেদের গ্রাম থেকে দীর্ঘপথ হেঁটে এসে নৌকায় চড়ামূল্যে নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে। মেরিন ড্রাইভ ধরে রাজারছড়া থেকে আরও কয়েক কিলোমিটার দূর নোয়াখালীপাড়া ঘাটের কাছে যাওয়ার পর দেখা হলো ফরিদুল হকের সঙ্গে। ২৫ বছরের যুবক ফরিদুলদের বাড়ি মিয়ানমারের মেরুল্যায়। গ্রামের বাজারে তাদের পাঁচটি দোকান আছে। তিন ভাই তিনটি দোকানে ব্যবসা করতেন, বাকি দুটি ভাড়া দিয়েছিলেন। বাংলাদেশে এসেছেন সপ্তাহখানেক আগে। কোনো শরণার্থী শিবিরে যেতে হয়নি তাদের ১৪ জনের পরিবারটিকে। টেকনাফের আউলিয়া পাড়ায় পূর্বপরিচিতদের কয়েকজনের বাড়িতে ভাগাভাগি করে আছেন। ফরিদুল গিয়েছিলেন উখিয়ার টেংখালী, সেখানে বস্তি মতো একটা বাড়ির দুটি ঘর ভাড়া করে ফিরছেন টেকনাফ। সবাইকে নিয়ে আবার যাবেন টেংখালী। বাড়ির ভাড়া, খাওয়া-দাওয়ার টাকা কোথায় পাবেন জানতে চাইলে ফরিদুল বলেন, মিয়ানমারের কিছু টাকা তাদের সঙ্গে ছিল, সেই সব বিনিময় করে বাংলাদেশের টাকা সংগ্রহ করেছেন। ফরিদুলের হাতে একটি মোবাইল ফোন দেখে নাম্বারটি জানতে চাইলাম, বললেন, নাম্বার এখনও মুখস্থ হয়নি। তবে তার ফোন থেকে কল দিয়ে নাম্বারটি আমরা নিতে পারি বলে জানালেন। ফরিদুল বললেন, সাগর পাড়ি দেওয়ার নৌকাভাড়া ৭০ হাজার টাকা বাকি রেখেছেন। ১৪ জনের জন্য পাঁচ হাজার করে এ ভাড়া হয়েছে। রহমান মাঝিকে ওই টাকা কয়েকদিনের মধ্যে মালয়েশিয়া থেকে পাঠাবেন ফরিদুলের ভাই অহিদুল হক। অহিদুল কয়েক বছর আগে বাংলাদেশে চলে এসেছিলেন এবং এখান থেকেই অবৈধ পথে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়ায় চলে গেছেন।

রহমান মাঝির মতো দয়াবান মাঝির সংখ্যা নেহায়েত হাতে গোনা। সমুদ্র পারাপারের নামে মাঝিরা শুরু করেছে নিষ্ঠুর বাণিজ্য। গত ২৪আগস্টের পর থেকে টেকনাফের জেলেদের নতুন কোনো নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। কিন্তু মাছ ধরা বাদ দিয়ে জেলেদের বড় একটি অংশ রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে নিয়ে আসার ব্যবসায় নেমে পড়েছে। টেকনাফে নিবন্ধিত মাছ ধরার নৌকা এক হাজার ৩৪৭টি। মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বিভিন্ন ঘাট ঘুরে খুব কম নৌকাই ঘাটে দেখা গেছে। অন্তত ৮০০ নৌকার মাঝিমাল্লা রোহিঙ্গা আনার ব্যবসা করছে বলে ধারণা পাওয়া গেছে। সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নূর হোসেন বলেন, এই ৮০০ নৌকার মাঝিদের নেতৃত্ব দিচ্ছে টেকনাফ থেকে নৌকায় মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে আদম পাচারকারী পুরোনো একটি চক্র।

নূর হোসেনের সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপ দিয়েই সবচেয়ে বেশি রোহিঙ্গা পারাপার হচ্ছে। মাঝারি নৌকায় ১০ থেকে ১২ জন এবং বড় নৌকায় ৩৫ থেকে ৪০ জন লোক তোলা হয়। জনপ্রতি পাঁচ থেকে ছয় হাজার করে ভাড়া নেওয়া হয়ে থাকে। প্রতিদিন একেকটি নৌকা চার-পাঁচবার ওপাড় থেকে লোক নিয়ে আসছে। থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত সিন্ডিকেটই রোহিঙ্গা পার করার ক্ষেত্রে এই রকমের নিষ্ঠুরতা দেখাচ্ছে।
মংডুর শীলখালী গ্রামের মোহম্মদ নাঈম এবং একই এলাকার সলিমুল্লাহদের কাছ থেকে সমুদ্র পথে ২৫ জনকে বাংলাদেশে এনে দেওয়ার বিনিময়ে বাংলাদেশি দেড় লাখ টাকা নেওয়ার পরও অতিরিক্ত টাকা দাবি করেন লেংগুরবিল তুলাতলী এলাকার দালাল নুরুল বশর মাঝি। টাকা দিতে না পারায় বশর মাঝি তাদের পরিবারের নারী ও শিশুদের আটকে রাখেন। পুরুষরা গিয়ে টেকনাফ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি সরোয়ার হোসেনের কাছে সহযোগিতা চান। সরোয়ার হোসেন জানান, পরে তিনি পুলিশ নিয়ে ওই নারী ও শিশুদের উদ্ধার করেন। উদ্ধারের পর নারীদের একজন নির্যাতনের যে বিবরণ দেন, তা থেকে বোঝা গেছে, বশরের ভাই কালু তাকে ধর্ষণ করেছে। এ নিয়ে নুরুল বশরের বক্তব্য জানার জন্য মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘ন বুঝির (বুঝতে পারছি না)। সাধু হথা ন হইয়ন (শুদ্ধ বলবেন না) বাংলা হন যে।’ বাংলা বলতে তিনি বোধ হয় চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষাকেই বুঝিয়েছেন। পরে গতকাল বিকেলে চট্টগ্রামের ভাষা জানেন এমন একজনের মাধ্যমে কথা বলার জন্য ফোন করা হলে বশর মাঝির ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। নাইম ও সলিমুল্লাহরা এখন আছেন কুতুপালং এলাকায়।

গতকাল দুপুরে উখিয়ার কুতুপালং থেকে আসা আবদুস শুক্কুরের কাছ এই রকম আরেকটি ঘটনার কথা আমরা জানতে পেলাম। শুক্কুর টেকনাফ এসেছেন কাউকে বলেকয়ে তার ভাগ্নে জাফরকে ছাড়িয়ে আনা যায় কি-না, সেই চেষ্টা করতে। সপ্তাহখানেক হলো জাফরকে আটকে রেখেছেন সাবরাং ইউনিয়নের মুন্ডারডেইল গ্রামের মোক্তার মোড়ল। সপ্তাহখানেক আগে রাশিদং এলাকার ধুনচি গ্রামের ২০ জনের সঙ্গে জাফরও এসেছিলেন। ২০ জনের দলটির সঙ্গে থাকা সমস্ত টাকা-পয়সা এবং সোনাদানা দেওয়ার পরও আরও ৭০ হাজার টাকা দাবি করেন মোক্তার। পরে জাফরকে জিম্মি করে বাকিদের ছেড়ে দেন। এরপর থেকে প্রতিদিনই জাফরকে নির্যাতন করা হচ্ছে এবং নির্যাতনের সময় টেলিফোনে তার আর্তনাদ শোনানো হয় তার আত্মীয়দের। এ ঘটনা জানার পর আমরা যোগাযোগ করলাম সাবরাং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নূর হোসেনের সঙ্গে। নূর হোসেন জানান, তিনি চট্টগ্রামে আছেন। তবে ছেলেটিকে উদ্ধার করা যায় কি-না, সে চেষ্টা করছেন। পরে টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাইন উদ্দিন খানকে বিষয়টি জানানো হলে তিনি মুন্ডারডেইলে পুলিশের ফোর্স পাঠান। পরে সন্ধ্যায় জানা যায়, পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) রাজীব পোদ্দার মুন্ডারডেইলে গিয়ে শুক্কুরকে দিয়ে মোক্তারের কাছে টাকা নিতে আসার জন্য ফোন করান। মোক্তার নিজে না এসে তার সহযোগী জামাল হোসেনকে পাঠান। পুলিশ জামালকে আটক করলেও মোক্তারকে ধরতে পারেনি। সর্বশেষ রাত ৯টায় জাফরকে উদ্ধার করে পুলিশ।

রাজীব নূর ও আবদুর রহমান, টেকনাফ থেকে

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

20 + one =