সেনাবাহিনী ও স্থানীয় একটি বিশেষ গোষ্ঠীর সহিংস হামলায় মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সমপ্রতি মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে। চলমান সহিংসতার শিকার হয়ে প্রথম তিন সপ্তাহে কেবল বাংলাদেশেই আশ্রয় নিয়েছে চার লাখেরও অধিক রোহিঙ্গা, যাদের মধ্যে কমপক্ষে দুই লাখ ৪০ হাজার শিশু। তাছাড়া ক্রমশই  দেশটিতে উদ্বাস্তু রোহিঙ্গার সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সামপ্রতিক পরিসংখ্যান অনুসারে, বর্তমানে দেশটিতে আশ্রিত উদ্বাস্তু রোহিঙ্গার সংখ্যা আট লক্ষাধিক। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্প সময়ের মধ্যে লাখ লাখ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু হওয়ার পেছনে মূলত এথনিক ক্লিনজিং বা গোষ্ঠী নিধন প্রক্রিয়াই কাজ করেছে। যদিও অপারেশনটি সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণ অভিযানের নামে পরিচালিত হচ্ছে।

বস্তুত সন্ত্রাস কখনো পুরো একটি জাতি বা গোষ্ঠীর ভিতরে লুকিয়ে থাকে না। কিন্তু লক্ষণীয় যে, মিয়ানমার সেনাবাহিনী নির্বিচারে রোহিঙ্গা গ্রামগুলোর প্রায় সব বসতিতেই অগ্নিসংযোগ করছে। উপরন্তু তাদের বর্বরোচিত হামলায় প্রতিনিয়তই মারা যাচ্ছে শত শত রোহিঙ্গা মুসলমান। যৌন হয়রানি ও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে অসংখ্য রোহিঙ্গা নারী। এমতাবস্থায় জীবন ও সম্মান বাঁচানোর তাগিদে নিরুপায় হয়ে নিজ নিজ বাসস্থান ছেড়ে পালাতে বাধ্য হচ্ছে হাজার-হাজার রোহিঙ্গা পরিবার। এমনকি ভয়াবহ এসব নির্যাতন থেকে বাঁচতে গর্ভবতী নারীরাও ক্রমাগত চার-পাঁচ দিন পায়ে হাঁটার দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিচ্ছেন। তবে পালাতে গিয়েও অনেকের মুক্তি মিলছে না। পথিমধ্যে তারাও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর গুলিবর্ষণের মুখে পড়ছেন। এতে অনেকেরই ঘটনাস্থলে মৃত্যু হচ্ছে, আবার অনেকে মারাত্মকভাবে আহত অবস্থায় অন্যের সহায়তায় বাংলাদেশে এসে চিকিত্সা নিচ্ছেন।

অন্যদিকে বাংলাদেশে উদ্বাস্তু হিসেবে আশ্রিত রোহিঙ্গারা যাতে রাখাইনে ফিরে না আসতে পারে, সেজন্য মিয়ানমারের সেনাবাহিনী সীমান্তে ল্যান্ড বা স্থল মাইন পুঁতে রাখছে। মজবুত করছে কাঁটাতারের বেড়া। উপরন্তু এসব ভয়াবহতা যাতে প্রকাশ না পায়, সে লক্ষ্যে রাখাইন রাজ্যে কোনো নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক বা গণমাধ্যমের প্রবেশও নিষিদ্ধ করেছে মিয়ানমার সরকার। তাদের তথ্য অনুযায়ী রাখাইন রাজ্যে ১৭৫টি গ্রাম থাকলেও রোহিঙ্গা অধ্যুষিত শতকরা ৩০ ভাগ গ্রামই এখন জনমানবশূন্য।

মিয়ানমার সফর করা পর্যবেক্ষকদের মতে, গত এক বছরে রাখাইন রাজ্যে দুটি সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ হামলাটি হয়েছে গত ২৫ আগস্ট দেশটির সীমান্তবর্তী একটি পুলিশ চৌকিতে। এতে ১২ জন পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। তথাপি হামলার ধরন থেকে অন্তত এটুকু স্পষ্ট যে, এখানকার সন্ত্রাসী গ্রুপটি নিতান্তই দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন। তাছাড়া এদের সংখ্যাও হাতেগোনা। এতে কোনোভাবেই সমগ্র রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী সংশ্লিষ্ট নয়।

ইতোমধ্যে গত রবিবার একটি ফেসবুক পোস্টে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর প্রধান রোহিঙ্গারা কখনো মিয়ানমারের জাতিগত গ্রুপ বা জনগোষ্ঠী নয় বলে মত দেন। এই মতের পরিপ্রেক্ষিতে চলমান সহিংসতার অন্তর্নিহিত  লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য বহুলাংশেই স্পষ্ট হয়। যে কোনো সচেতন ব্যক্তির পক্ষে এটার মর্মার্থ বোঝা কঠিন নয় যে, চলমান সহিংসতাটি সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে ঘটানো একটি জাতিগত নিধন মাত্র।

জাতিসংঘের মানবাধিকার রক্ষাবিষয়ক হাই কমিশনার জাইদ রা’দ আল-হুসেনও মিয়ানমারে চলমান এই সংকটকে জাতিগত নিধনের অন্যতম উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করেন। কেউ কেউ এটাকে জঘন্যতম গণহত্যা বলেও আখ্যা দেন। গত ১৪ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অব স্টেট রেক্স টিলারসন বলেন, বার্মায় চলমান সহিংসতা আমরা গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করছি। চলমান সহিংসতা ও হত্যাযজ্ঞ থেকে এটা পরিষ্কার যে, এটি একটি জাতিগত নিধন। অতএব মিয়ানমারকে অবশ্যই এমন হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে হবে।

১৯৯১ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অং সান সু চিকে অনেকেই ইতোপূর্বে কিংবদন্তি নেলসন ম্যান্ডেলার সঙ্গে তুলনা করতেন। কিন্তু মিয়ানমারের সর্বোচ্চ বেসামরিক নেতা হওয়া সত্ত্বেও তিনি এই সহিংসতা বন্ধ করতে ব্যর্থ হন। এতে বিশ্বব্যাপী সমালোচনার ঝড় ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে তিনি আচমকা চলমান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে যোগদানের নির্ধারিত সফর বাতিল করেন। সমপ্রতি জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুতেরেস বিবিসিকে বলেন, পরিস্থিতির ইতিবাচক উন্নয়নের জন্য তাকে সুযোগ দিতে হবে। তবে তিনি যদি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হন, নিঃসন্দেহে এই ভয়াবহতা লাগামহীন হয়ে পড়বে।

পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, পরিস্থিতির উন্নয়নে রোহিঙ্গাদের গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি। কেননা, বহু বছর আগে থেকেই তারা মিয়ানমারের উপেক্ষিত জনগোষ্ঠী। তাছাড়া রাখাইন রাজ্যেও তারা বহুকাল যাবত্ একরকম উদ্বাস্তু জীবনই যাপন করে আসছেন। বিভিন্ন প্রতিকূলতার মুখে প্রায়শই সেখানে তারা তাদের বাসস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন। এমনকি কয়েক দশক ধরে তারা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণের অধিকার থেকেও বঞ্চিত। অতএব সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে মনে হয়, রোহিঙ্গা মুসলমানরাই বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত সংখ্যালঘু সমপ্রদায়।

২০১৩ সালে হার্ভার্ড ডিভাইনিটি স্কুল কর্তৃক পরিচালিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে জানা যায়, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে অমানবিক জীবন-যাপন করছে। তারা শিক্ষা, কর্মসংস্থান, জনস্বাস্থ্য, আবাসন, ধর্মীয় কার্যকলাপ, আন্দোলন ও পারিবারিক জীবন সব ক্ষেত্রেই প্রতিনিয়ত চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।  রোহিঙ্গাদের জন্য প্রত্যেক পরিবারে দুটি সন্তান গ্রহণ বাধ্যতামূলক করে দেওয়া হয়েছে। এমনকি যে কোনো আন্দোলনে অংশগ্রহণ এবং নিজের পছন্দমত বিয়ে করার স্বাধীনতাও খর্ব করা হয়েছে। বিয়ে করার পূর্বে তাদের অবশ্যই মিয়ানমার সরকারের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু দেশটির অন্যান্য গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এরকম কোনো বিধি-নিষেধের কোনো বালাই নেই।

মিয়ানমারে ‘১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন’ কার্যকর হওয়ার পর থেকেই মূলত রোহিঙ্গা নির্যাতন ও নিপীড়ন তুঙ্গে ওঠে। তখন থেকেই দেশটির প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে থাকে। কালক্রমে নির্যাতনের মাত্রাও ক্রমশ বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে দেশটিতে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি উচ্চারণ করাও নিষিদ্ধ হয়ে যায়। দেশটির নেতারা নিজেরাও শব্দটির ব্যবহার বন্ধ করে দেন। এমনকি কেউ কেউ আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়কেও এই নাম ব্যবহার না করার জন্য অনুরোধ জানান। বৌদ্ধ নেতাদের অনেকেই তাদেরকে বাংলাদেশ থেকে আগত ‘বাঙালি রোহিঙ্গা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি রোহিঙ্গারা রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত মিয়ানমারের ১৩৫টি ক্ষুদ্র জাতিসত্তারও অন্তর্ভুক্ত নয় বলে তারা প্রচারণা চালান। তারা আরো বলেন, মিয়ানমারের সঙ্গে এই গোষ্ঠীর কোনো সম্পর্ক নেই।

কিন্তু নিরপেক্ষ গবেষকরা মনে করেন, একথা আদৌ সত্য নয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূলত ১৮ শতকের শেষের দিক থেকেই মিয়ানমার হতে বিশ্বের অন্যত্র বিশেষ করে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থীর ঢেউ শুরু হয়। পরবর্তীকালে ২০ শতকে (১৯৪০-এর দশকে, ১৯৭০-এর দশকে এবং ১৯৯০-এর দশকে) এসে তা নতুন মাত্রা পায়। ২০১৫ সালে দ্য ইকোনোমিস্টও রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সংবাদ মাধ্যমটি রোহিঙ্গাদের ইতিহাস পর্যালোচনা করে মত দেন, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারেরই একটি জাতিগোষ্ঠী। অতএব তাদেরকে নিজভূমিতেই ফিরিয়ে নেওয়া উচিত।

সারা ওয়াইল্ডম্যান
ভক্সের ওয়েবসাইট থেকে অনুবাদ :মো. সহিদুল ইসলাম
লেখক :সাংবাদিক ও কলামিস্ট

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

seventeen + six =