ড. শামসুল আরেফিন: গণমাধ্যম এবং বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ার ইতিবাচক প্রচারণার ফলে রোহিঙ্গা গণহত্যার বিষয়টি অবশেষে বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিতে সক্ষম হয়েছে। মিয়ানমার সরকারের অব্যাহত অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে মানব সম্প্রদায়। এর একটি স্থায়ী সমাধান এখন সময়ের দাবি। প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণ, দেশত্যাগে বাধ্য করার বিষয়টি একদিনে সৃষ্টি হয়নি। এর পেছনে নানামাত্রিক স্বার্থ-সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ ধীরে ধীরে প্রকাশিত হচ্ছে। উন্মোচিত হচ্ছে বার্মিজ সামরিক জান্তা ও সরকারের স্বরূপ। জাতিগত দ্বন্দ্ব, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনীতি, বহুজাতিক কোম্পানির বাণিজ্য ইত্যাদি বহু বিষয় সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের নিজ আবাস ছাড়তে বাধ্য করছে। জন্ম নিবন্ধন, বিয়ে, জমির দলিলপত্র, নাগরিকত্বসহ মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে তাদের উদ্বাস্তু হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।

রাখাইনে চলমান সংকটে উদ্বিগ্ন হয়ে যুক্তরাজ্য ও সুইডেন ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭ তারিখে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক আহ্বানের প্রস্তাব দেয়। এর ঠিক একদিন আগে চীন ‘শান্তি’ ও ‘স্থিতিশীলতা’ প্রতিষ্ঠায় মিয়ানমারের জঘন্য কর্মকাণ্ডে সহযোগিতার আশ্বাস প্রদান করে। পাকিস্তানের মিয়ানমারকে সামরিক সহায়তার খবর পত্রিকার কল্যাণে জানা গেছে। চীনের অবশ্য মিয়ানমার সরকারকে সমর্থনের  পেছনে নানাবিধ গূঢ় তাত্পর্য রয়েছে। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক সাসকিয়া সাসেন এ বছরের শুরুর দিকে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর বর্বরোচিত হামলা, নিধন ও সংকট নিয়ে তার গবেষণার মর্মকথা উপস্থাপন করেন। তার ভাষ্য থেকে জানা যায়, ‘রোহিঙ্গাদের ওপর এই নির্যাতনের পেছনে যে কারণগুলো রয়েছে ধর্ম ও জাতিগত ভিন্নতার দোহাই তার একটি অংশ মাত্র। গত দুই যুগে খনিজ, কাঠ, কৃষি আর পানির জন্য ভূমি দখলের লড়াইয়ে কর্পোরেট জগত্ বেশ উঠে-পড়ে লেগেছে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী সেই ১৯৯০-এর দশক থেকে সংখ্যালঘুদের জমি দখলের অভিযান চালিয়ে আসছে। তবে প্রথমে হুমকি-ধামকির মাধ্যমেই তাদের কার্যক্রম শুরু হয়। দুই যুগ ধরে এমনটাই চলে আসছে এবং ক্রমেই তা নৃশংসতার রূপ নেয়। বিশেষ করে শেষ কয়েক বছরে জমি দখলের অভিযান ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। ২০১২ সালের হামলার পর বড় প্রজেক্ট স্থাপনের জন্য যে পরিমাণ ভূমি দরকার ছিল, ২০১০-২০১৩ সালের মধ্যে দখলকৃত জমির পরিমাণ বেড়েছে ১৭০ শতাংশ। ২০১২ সালে ভূমি নিয়ন্ত্রণে যে আইন প্রবর্তিত হয় তা কেবল বিশাল মাপের কর্পোরেট দখলদারিত্বকেই সমর্থন করে। …সরকার ইতোমধ্যে ৩১ লাখ একর জমি অধিগ্রহণ করেছে যার পুরোটাতেই ছিল রোহিঙ্গাদের বাস’। সুতরাং, কর্পোরেট দখলদারের কাছ থেকে সনাতন ভূমি ফিরিয়ে এনে সেখানে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন যে প্রায় অসম্ভব তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

বিগত চার দশক ধরে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা আট থেকে ১০ লক্ষ। জাতিসংঘ শিশু তহবিল সুরক্ষা প্রধান জ্যঁ লিবে ১২ সেপ্টেম্বর এক বিবৃতিতে বলেছেন, শুধু ৪ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৭ এই ছয় দিনেই বাংলাদেশে এসেছে দুই লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা। রোহিঙ্গাদের এই ঢল খুব শিগগির কমবে এমন কোনো ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে না। মানবিক ও বিবেকবোধের তাড়নায় শরণার্থীদের অনুুপ্রবেশ রোধ এই মুহূর্তে সম্ভব নয়। তা কেউ ভাবছেও না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শরণার্থীদের সব ধরনের সহযোগিতা প্রদানের কথা উল্লেখ করে  রোহিঙ্গা জনগণের প্রতি অত্যাচার বন্ধ এবং বাংলাদেশ থেকে শরণার্থীদের ফেরত নিতে দেশটির প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলসহ সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পেশাজীবী সর্বস্তরের জনগণ রোহিঙ্গাদের সেবাব্রতে অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছে এবং সাধ্যমতো কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। উদারতার এ ভূমিকা ও মনোভাবের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশ উচ্চতর মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে। সবকিছু ছাপিয়ে রোহিঙ্গা ইস্যুটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মানবিক, ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক— সর্বোপরি বহুজাতিক বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ব্যাপারে এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ এবং সর্বোচ্চ গণসচেতনতা সৃষ্টি করা না গেলে বাংলাদেশের দীর্ঘস্থায়ী সংকটে পতিত হওয়ার আশঙ্কা ক্রমেই জোরদার হবে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের যত দ্রুত সম্ভব তাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নিতে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ফোরামে চাপ অব্যাহত রাখতে হবে। তাদের একটি নির্দিষ্ট এলাকায় বসবাসের ব্যবস্থা করতে হবে। কোনোক্রমেই দেশজুড়ে তাদের বিচরণের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা যাবে না। সংগত কারণেই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে রোহিঙ্গাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। ইতোমধ্যেই রোহিঙ্গা যুবতীদের প্রতি দালালচক্রের দৃষ্টি পড়েছে। বিয়ে, চাকরি বা অন্য কোনো অজুহাতে তাদের শরণার্থী শিবির থেকে অন্যত্র পুনর্বাসন করা চলবে না। আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সবাই খুব দায়িত্বশীল এমনটা ভাবার ফুরসত নেই। স্মরণ করা যেতে পারে, বাংলাদেশে মারণনেশা ‘ইয়াবা’ ট্যাবলেটের চালান বিপথগামী কিছুসংখ্যক রোহিঙ্গার মাধ্যমেই দেশজুড়ে বিস্তার লাভ করেছে। পত্রিকায় খবর এসেছে তাদের একটা অংশ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ছে। এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হলেও দেশের নিরাপত্তা ও সার্বিক অবক্ষয় রোধে এখনই তা বন্ধ করা জরুরি। তাদের প্রতি সর্বোচ্চ মানবতা প্রদর্শনের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতি উদাসীন হওয়া কোনোক্রমেই সুবিবেচনাপ্রসূত হবে না। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে এজন্য দলমত নির্বিশেষে সকল স্তরের মানুষের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টির বিকল্প নেই। বোধটি যত তাড়াতাড়ি বিস্তার ও সম্প্রসারিত হবে ততই মঙ্গল।

 লেখক :গবেষক
arefinugc¦yahoo.com

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

11 − 8 =