নেশাটা তাঁর ফুটবলের। মাঠে নেমে খেলার নয়, দেখাতেই আনন্দ। সে টানেই প্রায় ৩০ বছর ধরে একপ্রকার ‘ভবঘুরে’ জীবন কাটাচ্ছেন লিও হোয়েনিগ। পাড়ি দিচ্ছেন এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশ, ঘুরছেন এক দেশ থেকে আরেক দেশ। এই পায়ের ছোঁয়া পাওয়া ৬৯তম দেশ হলো বাংলাদেশ। প্রিমিয়ার লিগের দুটো ম্যাচ দেখে বাংলাদেশের ফুটবলকে অভিজ্ঞতার ঝুলিতে ভরে চলে গেছেন আবার।

চীন থেকে তিন দিনের ছোট এক সফরে বাংলাদেশে এসেছিলেন ব্রিটিশ এই ফুটবল পরিব্রাজক। বৃহস্পতিবার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে বসে উপভোগ করেছেন বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের দুটি ম্যাচ। বুধবার বাংলাদেশে পা রাখা হোয়েনিগ গতকালই ঢাকা ত্যাগ করেছেন। নতুন গন্তব্য ভারত।

৫৯ বছর বয়সী হোয়েনিগ পেশায় প্রকৌশলী। কিন্তু বিশ্ব ফুটবল ঘুরে ঘুরে দেখার নেশা ‘ক্যানসারের’ মতো বাসা বেঁধেছে তাঁর হৃদয়ে। তাই পেশাগত কাজকর্ম নিয়ে খুব একটা মাথাব্যথা নেই। ফুটবল দেখার ফাঁকে ফাঁকে চাকরি রক্ষা করা মাত্র। না হলে এক বছরের ছুটি নিয়ে পুরোদমে ফুটবল মাঠে ছোটা! পরিবারকেও দেওয়া হয় না তেমন একটা সময়। আট বছরের একমাত্র ছেলেকে নিয়ে স্ত্রী থাকেন চীনে। ফুটবল মাঠের তুলনায় সেখানে তাঁর পদধূলি পড়ে খুব কমই।

অলিম্পিক মার্শেই-সমর্থক হওয়ায় ১৯৮৯ সালে ফ্রান্স সফর দিয়ে শুরু হয়েছিল হোয়েনিগের ফুটবল অভিযান। প্রায় ৩০ বছর পরে এসে এখনো ক্লাবটির সাফল্য মুখস্থ বলেন ক্লাসের পড়ার মতো, ‘কী দলটাই না ছিল অলিম্পিক মার্শেই। ক্রিস ওয়াডেল, জিন পিয়েরা ও এরিক ক্যান্টোনাকে নিয়ে নিয়মিত জিতত ফ্রেঞ্চ লিগের শিরোপা।’

এর পরে দীর্ঘ পথপরিক্রমায় জার্মানি, ইতালি হয়ে এশিয়ায় পা রাখা। ২০০২ সালের জাপান-কোরিয়া বিশ্বকাপে। কিন্তু প্রিয় দল ফ্রান্স বিদায় নেয় গ্রুপ পর্ব থেকেই। এ নিয়ে আফসোসটা এখনো আছে। তবে ব্রাজিলের ওই দুর্দান্ত প্রজন্মকে স্বচক্ষে দেখার গর্বটাও কম নয়, ‘রোনালদো, রিভালদোকে আক্রমণে খেলতে দেখেছি। কাফু ও রকি জুনিয়রকে দেখেছি ফুলব্যাকে। কী দুর্দান্ত একটা দল। থিয়েরি অরি, বার্থেজদের নিয়ে ফ্রান্স দলটাও ছিল দুর্দান্ত। কিন্তু ভালো করতে পারল না।’

আরও পড়ুনঃ   আরও একবার ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় সাকিবদের

শুধু এক বিশ্বকাপ দেখে বসে থাকার মানুষ তো নন; ২০০৬ বিশ্বকাপ দেখতে ছুটেছিলেন জার্মানিতেও। হেনরিক লারসন ও জ্লাতান ইব্রাহোমিচের সুইডিশ আক্রমণভাগের গল্প এখনো তাঁর মনে লেগে আছে প্রথম পদ্মার ইলিশ মাছ খাওয়ার স্বাদের মতো, ‘লারসন ও ইব্রাহোমিচের কী দুর্দান্ত জুটি। কিন্তু প্যারাগুয়ের বিপক্ষে তারা কেউ গোল করতে পারল না। সুইডেন ১-০ গোলে জিতল ফেডি লুজেনবার্গের গোলে।’

বিশ্বকাপ দেখার অভিজ্ঞতা এই দুবারই। তবে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচ দেখেছেন অগণিত। সে তালিকায় আছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ার ম্যাচ। বাদ যায়নি মালদ্বীপ, ভুটান বা মিয়ানমারও। তাই হয়তো আবাহনী লিমিটেড ও চট্টগ্রাম আবাহনী এবং শেখ জামাল ও ফরাশগঞ্জের খেলা ভালোই লেগেছে তাঁর, ‘বাংলাদেশের লিগের মানটা অনেক মিয়ানমারের মতো। তবে পরিষ্কারভাবে ভুটানের চেয়ে এগিয়ে।’

এক দেশের সীমানা পেরিয়ে আরেক দেশ। এ তথ্যগুলো নিয়ে শিগগিরই প্রকাশিত হবে ‘অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন নাইনটি মিনিটস।’ সেখানে খুব ভালোভাবেই জায়গা পাবে বাংলাদেশের গল্প।

বাংলাদেশ পর্বটা শেষ করে গতকালই পাড়ি জমিয়েছে ভারতে। উদ্দেশ্য আইএসএল ও আইলিগের ম্যাচ দেখা। ওখানেও ক্যামেরা ও ডায়েরি হাতে এক ব্রিটিশ ভদ্রলোককে দেখে হয়তো অবাক হবে অনেকেই। শুধু ফুটবলের টানেই ছুটে এসেছেন এখানে, এটা শোনার পর যে গ্যালারিতে বাড়তি আদর-যত্ন জুটবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ফুটবলের টানে কাঁটাতারের সীমান্তকে জয় করছেন যে মানুষটি, তাঁর জন্য একটু খাতির-যত্নের ব্যবস্থা করাটাও আনন্দের।

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

fourteen + ten =