১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে মায়ানমার সরকারের বৈষম্যমূলক নীতি বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির হাজার হাজার মুসলিম রোহিঙ্গাকে তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছে। তাদের বেশিরভাগই স্থলসীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। অন্যরা সমুদ্র পথে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে আশ্রয় নিয়েছেন। ২০১৬ সালের অক্টোবরে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ধর্ষণ, খুন এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনাসহ নতুন করে শুরু হওয়া সহিংসতা পশ্চিম মায়ানমারের প্রায় কয়েক লাখ রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে বাস্তুচ্যুত করেছে। মায়ানমারের অনেক প্রতিবেশিদের কাছ থেকে সামান্য প্রতিক্রিয়া দিয়ে তাদের দুর্দশাকে জটিল করেছে। রোহিঙ্গা কারা? বর্তমান মায়ানমারের রোহিং (আরাকানের পুরনো নাম) এলাকায় এ জনগোষ্ঠীর বসবাস। ইতিহাস ও ভূগোল বলছে, রাখাইন প্রদেশের উত্তর অংশে বাঙালি, পার্সিয়ান, তুর্কি, মোগল, আরবীয় ও পাঠানরা বঙ্গোপসাগরের উপকূল বরাবর বসতি স্থাপন করেছে। তাদের কথ্য ভাষায় চট্টগ্রামের স্থানীয় উচ্চারণের প্রভাব রয়েছে। উর্দু, হিন্দি, আরবি শব্দও রয়েছে। রাখাইনে দুটি সম্প্রদায়ের বসবাস ‘মগ’ ও ‘রোহিঙ্গা’। মগরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। মগের মুল্লুক কথাটি বাংলাদেশে পরিচিত। দস্যুবৃত্তির কারণেই এমন নাম হয়েছে ‘মগ’দের। এক সময় তাদের দৌরাত্ম্য ঢাকা পর্যন্ত পৌঁছেছিল। মোগলরা তাদের তাড়া করে জঙ্গলে ফেরত পাঠায়। রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে একটি প্রচলিত গল্প রয়েছে, সপ্তম শতাব্দীতে বঙ্গোপসাগরে ডুবে যাওয়া একটি জাহাজ থেকে বেঁচে যাওয়া লোকজন উপকূলে আশ্রয় নিয়ে বলেন, আল্লাহর রহমে বেঁচে গেছি। এই রহম থেকেই এসেছে রোহিঙ্গা। তবে ওখানকার রাজসভার বাংলা সাহিত্যের লেখকরা ওই রাজ্যকে রোসাং বা রোসাঙ্গ রাজ্য হিসাবে উল্লেখ করেছেন। ইতিহাস বলছে, ১৪৩০ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত ২২ হাজার বর্গমাইল আয়তনের রোহিঙ্গা স্বাধীন রাজ্য ছিল। মায়ানমারের রাজা বোদাওফায়া এ রাজ্য দখল করার পর বৌদ্ধ আধিপত্য শুরু হয়। এক সময়ে ব্রিটিশদের দখলে আসে এ ভূখণ্ড। তখন বড় ধরনের ভুল করে তারা এবং এটা ইচ্ছাকৃত কিনা? সে প্রশ্ন জ্বলন্ত। তারা মায়ানমারের ১৩৯টি জাতিগোষ্ঠীর তালিকা প্রস্তুত করে। কিন্তু তার মধ্যে রোহিঙ্গাদের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এ ধরনের বহু ভুল করে গেছে ব্রিটিশ শাসকরা। ১৯৪৮ সালের চার জানুয়ারি মায়ানমার স্বাধীনতা অর্জন করে এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু হয়। সে সময়ে পার্লামেন্টে রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল। এ জনগোষ্ঠীর কয়েকজন পদস্থ সরকারি দায়িত্বও পালন করেন। কিন্তু ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করলে মিয়ানমারের যাত্রাপথ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হতে শুরু করে। রোহিঙ্গাদের জন্য শুরু হয় দুর্ভোগের নতুন অধ্যায়। রোহিঙ্গাদের আইনি অবস্থা কি? মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং এর ফলে রোহিঙ্গাদের কোনো আইনি ডকুমেন্টেশন নেই এবং এই অবস্থা তাদেরকে রাষ্ট্রহীন করে তোলে। ১৯৪৮ সালের মায়ানমারের নাগরিকত্ব আইন ইতোমধ্যেই বর্জন করা হয়েছে এবং সামরিক জান্তা ১৯৬২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে নেয়। সামরিক জান্তা রোহিঙ্গাদের বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে। তাদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। ভোটাধিকার কেড়ে নেয়া হয়। ধর্মীয়ভাবেও অত্যাচার করা হতে থাকে। নামাজ আদায়ে বাধা দেয়া হয়। হত্যা-ধর্ষণ হয়ে পড়ে নিয়মিত ঘটনা। সম্পত্তি জোর করে কেড়ে নেয়া হয়। বাধ্যতামূলক শ্রমে নিয়োজিত করা হতে থাকে। তাদের শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ নেই। বিয়ে করার অনুমতি নেই। সন্তান হলে নিবন্ধন নেই। জাতিগত পরিচয় প্রকাশ করতে দেয়া হয় না। সংখ্যা যাতে না বাড়ে, সে জন্য আরোপিত হয় একের পর এক বিধিনিষেধ। ১৯৮৯ সাল থেকে মায়ানমার তিন ধরনের নাগরিক কার্ডের প্রচলন করে। পূর্ণাঙ্গ নাগরিকদের জন্য গোলাপি, সহযোগী নাগরিকদের জন্য নীল এবং অভিযোজিত নাগরিকদের জন্য সবুজ রঙের কার্ড দেওয়া হয়। চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, পড়াশোনা-চিকিৎসাসেবাসহ সব ধরনের কাজকর্মে এই কার্ডের ব্যবহার শুরু হয়। কিন্তু রোহিঙ্গাদের কোনো ধরনের কার্ড দেওয়া হয় না। এর ফলে রোহিঙ্গাদের পক্ষে মায়ানমারে টিকে থাকা দুরূহ হয়ে পড়ে। ১৯৯৪ সাল থেকে রোহিঙ্গা শিশুদের জন্মনিবন্ধন বন্ধ করে দেয় মায়ানমার সরকার। পরে জাতিসংঘের উদ্বাস্তু বিষয়ক হাইকমিশনের চাপে রোহিঙ্গাদের তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ শুরু হয় ১৯৯৫ সালে। এ সময় রোহিঙ্গাদের দেওয়া হয় সাদা কার্ড, যেখানে জন্মস্থান এবং তারিখ লেখা হয় না। এর ফলে এই কার্ড মায়ানমারের নাগরিকত্ব প্রমাণ করে না এবং রোহিঙ্গাদের কোনো কাজেও আসে না। কয়েক বছর পর এই কার্ডও বন্ধ করে দেয় সরকার। রোহিঙ্গাদের নাম শুধু তালিকাভুক্ত করে রাখা হয় নাসাকা বাহিনীর খাতায়। ২০১৪ সালে জাতিসংঘের সহায়তায় ত্রিশ বছরের মধ্য প্রথমবারের মতো জাতীয় আদমশুমারি অনুষ্ঠিত হয়। সেসময় মুসলিম সংখ্যালঘু এই গোষ্ঠীকে প্রাথমিকভাবে রোহিঙ্গা হিসেবে চিহ্নিত করার অনুমতি দেয়া হয়েছিল কিন্তু উগ্রপন্থী বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীরা এই শুমারি বয়কটের হুমকি দেয়ার পর সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে, রোহিঙ্গারা কেবল তালিকাভুক্ত হতে পারে, যদি তারা নিজেদেরকে বাঙালি হিসেবে চিহ্নিত করে। একইভাবে, বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীদের চাপের মুখে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট থিয়েন সেইন ২০১৫ সালের সংবিধানিক গণভোটে রোহিঙ্গাদের ভোটের অধিকার বাতিল করেন। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি রোহিঙ্গাদের অস্থায়ী পরিচয় পত্র বাতিল করে কার্যত তাদের নতুন করে পাওয়া ভোটের অধিকারকে কেড়ে নেন। উল্লেখ্য, সাদা কার্ড ধারীদের মায়ানমারের ২০০৮ সালের সাংবিধানিক গণভোট এবং ২০১০ সালের সাধারণ নির্বাচনে ভোট দেয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। ২০১৫ সালের নির্বাচনে কোনো সংসদীয় আসনে মুসলিম বিশ্বাসের কোনো প্রার্থী ছিল না। সেসময় আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘দেশটিতে ব্যাপক মুসলিম-বিরোধী মনোভাব সরকারকে মুসলমানদের অধিকারের বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য রাজনৈতিকভাবে কঠিন করে তোলে।’ রোহিঙ্গা কেন মায়ানমার থেকে পালাচ্ছে? নিজ গ্রামের উন্মুক্ত কারাগারে আট লাখ রোহিঙ্গাকে বন্দি করার মতো বড় কারাগার মায়ানমার তৈরি করতে পারেনি, তাই রোহিঙ্গারা নিজ গ্রামেই বন্দি। মায়ানমারের অন্য কোনো অঞ্চলে যাওয়ার কথা তো দূরূহ, পাশের গ্রামে যাওয়ারও কোনো অনুমতি নেই তাদের। নিজ গ্রামের বাইরে যেতে হলে তাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কাছ থেকে ট্রাভেল পাস নিতে হয়। এই ট্রাভেল পাস নিয়েই তারা গ্রামের বাইরে যেতে পারে। কিন্তু ট্রাভেল পাস পাওয়া কঠিন বিষয়। এ জন্য রক্ষীবাহিনীকে দিতে হয় বড় অঙ্কের ঘুষ। তার পরও রক্ষা নেই। যদি ট্রাভেল পাসে উল্লিখিত নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিজ গ্রামে ফিরতে ব্যর্থ হয় কোনো রোহিঙ্গা, তা হলে তার নাম কাটা যায় ওই গ্রামের তালিকাভুক্তি থেকে। সে তখন নিজ গ্রাম নামের কারাগারেও অবৈধ হয়ে পড়ে। তাদের ঠাঁই হয় জান্তা সরকারের জেলখানায়। বিয়েতে বাধা, সন্তান ধারণে নিয়ন্ত্রণ! ১৯৯০ সালে আরাকান রাজ্যে স্থানীয় আইন জারি করা হয়। আইনটিতে উত্তর আরাকানে বাস করা মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এই আইন অনুযায়ী এই অঞ্চলে বাস করা রোহিঙ্গাদের বিয়ের আগে সরকারি অনুমোদন নেয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। এই অনুমোদনের দায়িত্বে রয়েছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী। সাধারণত বিয়ের অনুমোদন পাওয়া খুবই কঠিন। সরকারি ফির পাশপাশি এ জন্য বিপুল পরিমাণ ঘুষ দিতে হয় নাসাকার লোকজনকে। তার পরও বিয়ের অনুমতি পেতে অধিকাংশ সময় বছরের পর বছর চলে যায়। এই অনুমোদন পাওয়া খুব কষ্টকর এবং প্রায় ক্ষেত্রেই অসম্ভব। বিয়ের জন্য নবদম্পতিকে মুচলেকা দিয়ে বলতে হয় যে এই দম্পতি দুইয়ের অধিক সন্তান নেবে না। চিকিৎসা ও শিক্ষায় সীমিত অধিকার রোহিঙ্গাদের জন্য মায়ানমারের নাগরিক অধিকার অনেক দূরের ব্যাপার। সরকারি চাকরি তাদের জন্য নিষিদ্ধ। উত্তর আরাকানের সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে রোহিঙ্গাদের জন্য নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্যসেবা চালু আছে। কিন্তু এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রাখাইন এবং বার্মিজ নাগরিকরা স্থানীয় রাখাইন ভাষায় কথা বলার কারণে রোহিঙ্গারা সেখানে গিয়ে পূর্ণ চিকিৎসা নিতে পারে না। সরকারি বড় হাসপাতালে তাদের প্রবেশ পদ্ধতিগতভাবে নিষিদ্ধ। আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের জন্য কোনো স্বাস্থ্যসেবার উদ্যোগ নিতে পারে না। এমনকি রোহিঙ্গা মহিলাদের জরুরি ধাত্রীবিদ্যা শেখানোর উদ্যোগ নিয়েও মায়ানমার সরকারের কাছে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে সেবা সংস্থাগুলো। শিক্ষার ক্ষেত্রেও রোহিঙ্গারা বৈষম্যের শিকার। ধীরে ধীরে তাদের অধিকার সংকুচিত করে ফেলেছে মায়ানমার সরকার। রোহিঙ্গাদের মধ্যে অশিক্ষার হার ৮০ শতাংশ, যা মায়ানমারের সাধারণ অশিক্ষার হারের দ্বিগুণ। উত্তর আরাকানের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে এমনিতেই মাধ্যমিক স্কুলের সংখ্যা খুব কম; কিন্তু গ্রামের বাইরের সেই স্কুলগুলোতে পড়তে গেলেও ট্রাভেল পাস নিতে হয় রোহিঙ্গা শিক্ষার্থীদের। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়ার অনুমোদন বন্ধ করা হয় ২০০১ সালে। তখন থেকে শুধু দূরশিক্ষণ পদ্ধতিতে ঘরে বসে রোহিঙ্গারা উচ্চশিক্ষা পেতে পারত এবং পরীক্ষা দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারত। ২০০৫ সাল থেকে এই নিয়মও বন্ধ করে দেয় মায়ানমার জান্তা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রোহিঙ্গাদের দেশত্যাগের কারণ? একজন রোহিঙ্গা পুরুষ কর্তৃক এক বৌদ্ধ নারীকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে ২০১২ সালে রাখাইনে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। সেসময় বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীরা রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। তারা প্রায় তিন শতাধিকেরও বেশি মানুষকে হত্যা করে এবং হাজার হাজার মানুষকে বাস্তুচ্যুত করে। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ রোহিঙ্গা বিরোধী সহিংসতাকে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ বলে চিহ্নিত করেছে। অধিকাংশ বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। অন্যরা চোরাচালানকারীদের শিকারে পরিণত হয়। ২০১৫ সালে অ্যামনেস্টির পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘হাজার হাজার রোহিঙ্গা সমুদ্রপথে বিপজ্জনক নৌকাযোগ অন্যত্র পাড়ি দিচ্ছে। এমতবস্থায় তাদের অনেকে বেঁচে নাও থাকতে পারে।’ ২০১৬ সালের অক্টোবরে মায়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তে নিরাপত্তার পোস্টে অজ্ঞাত বন্দুকধারীর হামলার পর রাখাইনের জাতিগত সহিংসতার আরেকটি প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ হামলার জন্য রোহিঙ্গাদের দায়ী করে। পরে সামরিক ও পুলিশ বাহিনী রোহিঙ্গা দমনে অভিযান শুরু করে। রোহিঙ্গাদের কয়েক হাজার ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হয়। হাজার হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। নিরাপত্তা বাহিনী খাদ্য ও চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা কর্মীদের সেখানে প্রবেশে বাধা দেয়। মায়ানমার বাহিনীর অবরোধের মুখে চলতি বছরের ২৪ আগস্ট মধ্যরাতের পর রোহিঙ্গা যোদ্ধারা অন্তত ২৫টি পুলিশ স্টেশনে হামলা ও একটি সেনাক্যাম্পে প্রবেশের চেষ্টা চালায়। এতে মায়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ শুরু হয়। এরপর রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে অভিযান শুরু করে মায়ানমারের সেনাবাহিনী। তাদের সঙ্গ যোগ দেয় দেশটির বৌদ্ধ চরমপন্থীরাও। অভিযানে হেলিকপ্টার গানশিপেরও ব্যাপক ব্যবহার করে মায়ানমার সেনাবাহিনী। সীমান্তে পুঁতে রাখায় হয় স্থলমাইন। মায়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা, কুপিয়ে হত্যা, নারীদের গণর্ষণের অভিযোগ উঠে। তারা রোহিঙ্গাদের হাজার হাজার ঘরবাড়ি এবং একের পর এক রোহিঙ্গা গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়। তাদের হত্যাযজ্ঞ থেকে রেহাই পায়নি বয়োবৃদ্ধ নারী এবং শিশুরাও। তিন সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা এই সহিংসতায় প্রায় ৩ হাজার রোহিঙ্গা প্রাণ হারিয়েছে। জেনেভায় এক সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের (ইউএনএইচসিআর) মুখপাত্র ভিভিয়ান জানান, মায়ানমারের রাখাইনে কমপক্ষে এক হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করেছে দেশটির সেনাবাহিনী। জাতিগত নিধনযজ্ঞের মুখে প্রায় ৪ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে। রোহিঙ্গারা কোথায় অভিবাসী হচ্ছেন? • বাংলাদেশ: অধিকাংশ রোহিঙ্গা প্রতিবেশি বাংলাদেশের আশ্রয় নিয়েছে। তাদের মধ্যে হাজার হাজার নিবন্ধিত শরণার্থী রয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থী শিবিরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, হাজার হাজার অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থী দেশটিতে বসবাস করছে। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে উদ্বাস্তুদের ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা শুরু করার জন্য সম্মত হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। • মালয়েশিয়া: জাতিসংঘের তথ্যানুযায়ী, ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত মালয়েশিয়ার ১৫০,৭০০ জন নিবন্ধিত শরণার্থীর মধ্য ৯০ শতাংশের বেশি মায়ানমার থেকে এসেছে। যেসব রোহিঙ্গা নিরাপদে মালয়েশিয়ায় এসেছে তাদের কোনো আইনগত অবস্থা নেই এবং তাদের কাজের কোনো অনুমতি নেই। সেখানে তারা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। • থাইল্যান্ড: আঞ্চলিক মানব পাচারের জন্য থাইল্যান্ড হচ্ছে একটি প্রধান কেন্দ্র এবং রোহিঙ্গাদের জন্য একটি সাধারণ ট্রানজিট পয়েন্ট হিসাবে ব্যবহার করা হয়। পায়ে হেঁটে কিংবা নৌকাযোগে ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়ায় যাওয়ার আগে অভিবাসীরা প্রায়ই নৌকাযোগে এখানে এসে পৌঁছায়। সেনাবাহিনী-নেতৃত্বাধীন থাই সরকার চোরাচালান রোধে প্রদক্ষেপ নিলে সেখানকার উপকূল সংলগ্ন এলাকাগুলোতে গণকবরের সন্ধান পাওয়া যায়। পাচারকারীরা রোহিঙ্গাদের ওইসব এলাকায় এনে আটক রাখত। রোহিঙ্গাদের পাচার করার সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে ২০১৭ সালে জেনারেল পদমর্যাদার পুলিশ কর্মকর্তা, প্রাদেশিক কর্মকর্তা ও পুলিশসহ কয়েক ডজন লোককে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তবে কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, পাচারকারীদের শাস্তি কেবল নেটওয়ার্ককে ব্যাহত করে, কিন্তু তাদের ধ্বংস করা হয় না। • ইন্দোনেশিয়াঃ রোহিঙ্গারা ইন্দোনেশিয়ায়ও আশ্রয় প্রার্থণা করেছে। যদিও মায়ানমার থেকে শরণার্থীদের সংখ্যা দেশটিতে তুলনামূলকভাবে কম। ২০১৫ সালের শরনার্থীদের ঢেউ শুরু হলে ইন্দোনেশিয়ার সামরিক প্রধান উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে, ইমিগ্রেশন সীমাবদ্ধতা সহজ করা হলে মানুষের অন্তঃপ্রবাহ স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়বে। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ইন্দোনেশিয়া এক হাজার রোহিঙ্গাকে গ্রহণ করে এবং তাদের জরুরি সহায়তা ও সুরক্ষা প্রদান করে। মায়ানমারের বেসামরিক নেতৃত্ব পূর্বের সরকারের নীতির কি কোনো পরিবর্তন করেছে? ২০১১ সালে মায়ানমারের প্রথমবারে মতো গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসে। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন যে, উগ্রপন্থী বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীদের চাপে বর্তমান নেতৃত্ব রোহিঙ্গা ও অন্যান্য মুসলমানদের পক্ষে কাজ করতে অনিচ্ছুক। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে ২০১৬ সালে একটি অ্যাডভাইজরি কমিশন গঠনকে অনেকে একটি ইতিবাচক বিকাশ হিসাবে চিহিৃত করেছিল। তবে ক্রমাগত সহিংসতা পর্যবেক্ষকদের আশাকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। প্রতিবেশিসহ বিশ্ব নেতৃবৃন্দের প্রতিক্রিয়া কেমন? রোহিঙ্গাদের গণহত্যা এবং নিপীড়নের নিন্দা জানিয়ে পাকিস্তান, ভারত, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার প্রতিবাদকারী বিক্ষোভ করছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ২০১৭ সালের রাখাইনের হত্যাযজ্ঞকে ‘গণহত্যা’ হিসাবে নিন্দা করেন এবং জাতিসংঘের শীর্ষ মানবাধিকার কর্মকর্তা রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো নিপীড়নকে ‘জাতিগত নিধন’ হিসাবে বর্ণনা করেছেন। মায়ানমারের চলমান সঙ্কটে সু চি’র নিষ্ক্রিয় অবস্থানের তীব্র নিন্দা করেছেন সর্বকনিষ্ঠ নোবেল শান্তি বিজয়ী মালালা ইউসুফজাই। তিনি মায়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে রক্ষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। একইসঙ্গে তিনি রোহিঙ্গাদের পক্ষে মুখ খোলার জন্য মায়ানমারের নেত্রী অং সান সু চির প্রতি আহ্বান জানান। সবকনিষ্ঠ এই নোবলে বিজয়ী বলেন, ‘মায়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের দুর্দশা দেখে আমার হৃদয় ভেঙ্গে যায়। হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে, এ অবস্থায় আমরা চুপ থাকতে পারি না।’ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর সরকারের আচরণ নিয়ে নীরব ভূমিকায় থাকা দেশটির সরকারপ্রধান ও শান্তিতে নোবেল জয়ী অং সাং সু চির সমালোচনা করেছেন আরেক নোবেল জয়ী ডেসমন্ড টুটু। সরকারের আচরণে সৃষ্ট রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে হস্তক্ষেপ করতে সুচিকে এগিয়ে আসার আহ্বানও জানান দক্ষিণ আফ্রিকার এই এমিরেটাস ধর্মযাজক। ৭ সেপ্টেম্বর প্রিটোরিয়ায় নিযুক্ত মায়ানমার দূতাবাসের মাধ্যমে সূচিকে দেয়া এক খোলা চিঠির মাধ্যমে এই আহ্বান জানান তিনি। চিঠিতে তিনি সু চিকে অত্যন্ত প্রিয় বোন হিসেবে উল্লেখ করেন। বলেন, ‘আমার ডেস্কে তোমার একটি ছবি থাকত আর সেই ছবির দিকে তাকিয়ে সব সময় গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের কথাই ভাবতাম সব সময়।’ রোহিংঙ্গা ইস্যুতে তিনি বলেন, ‘নীরবতাই যদি মায়ানমারের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনৈতিক মূল্য হয় তাহলে এই মূল্য সত্যিই খুব চড়া।’ মায়ানমারের চলমান সঙ্কটের দ্রুত অবসানের জন্য দেশটির কর্মকর্তাদের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্টেনিও গুতেরেস। রোহিঙ্গা ইস্যুতে নিজের উদ্বেগ প্রকাশ করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানো একটি চিঠিতে গুতেরেস বলেন, অব্যাহত সহিংসতা মানবিক বিপর্যয় ঘটাতে পারে। যদিও তিনি সরাসরি অং সান সু চির সমালোচনা করেননি। তবে তিনি মায়ানমারের নেতাদের নিন্দা করেছেন। ৫ সেপ্টেম্বর সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘এই সহিংসতার অবসান ঘটানোর জন্য বেসামরিক এবং সামরিক কর্তৃপক্ষসহ মায়ানমারের সকল কর্তৃপক্ষের কাছে আমি আবেদন করছি। আমার মতে, সেখানে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যা এই অঞ্চলের অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে।’

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

nineteen − 3 =