আবু কাওসার:

সরকারি মোট ২৫টি কোম্পানির শেয়ার বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল ২০১০ সালে। সাত বছর পার হলেও কোম্পানিগুলো শেয়ার ছাড়তে পারেনি। কবে ছাড়া হতে পারে, সেটিও নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছেন না। কোম্পানিগুলোর মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি লিমিটেড বা বিটিসিএল, সোনারগাঁও হোটেল, ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরি, লিকুফাইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস লিমিটেড বা এলপিজিএল, সিলেট গ্যাস ফিল্ড, নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি, বাখরাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড, গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড, জালালাবাদ গ্যাস সিস্টেম লিমিটেড, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড, বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড লিমিটেড, রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড। এ কোম্পানিগুলোর মধ্যে নয়টি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের। বিদ্যুৎ বিভাগের চারটি। পাঁচটি শিল্প মন্ত্রণালয়ের। পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তিনটি। এ ছাড়া ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের চারটি।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের জুনের মধ্যে ওই সব প্রতিষ্ঠানকে শেয়ার ছাড়ার সর্বশেষ সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এই এক বছর প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকা- নিবিড়ভাবে তদারক করা হবে। এ জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মুসলিম চৌধুরীর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রতি দুই মাস পর কমিটি বৈঠক করে কোম্পানিগুলোর শেয়ার ছাড়ার অগ্রগতি পর্যালোচনা করবে। কমিটির অন্য সদস্যরা হচ্ছেন- পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি, জ্বালানি মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ বিভাগ ও বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন বা আইসিবির প্রতিনিধি। সূত্র বলেছে, এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা উম্নতির জন্য প্রয়োজনে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে আলাদা বরাদ্দ দেওয়া হবে।

কোম্পানির প্রতিনিধিরা দাবি করেছেন, এসব কোম্পানির অধিকাংশ লোকসানি। এ জন্য শেয়ার ছাড়া মুশকিল। তবে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার না ছাড়ার পেছনে আমলরাই বড় বাধা হিসেবে কাজ করছেন বলে মনে করছেন পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, শেয়ার বাজারে এলে এসব কোম্পানি জবাবদিহির আওতায় আসবে। তখন সুযোগ-সুবিধা কমে যাবে তাদের। এ জন্য বিরোধিতা করা হচ্ছে। সরকারের উচিত, সব বাধা অপসারণ করে দ্রুত শেয়ার ছাড়ার ব্যবস্থা করা। এতে করে শেয়ারবাজারের গভীরতা বাড়বে। লাভবান হবেন বিনিয়োগকারীরা।

যোগাযোগ করা হলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ সমকালকে বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ চলছে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত বাজারে শেয়ার আনার লক্ষ্যে শিগগিরই কনসালট্যান্ট নিয়োগ করা হবে। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ হবে। ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব শ্যাম সুন্দর সিকদার বলেন, তার মন্ত্রণালয়ের অধীনে চারটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ছাড়তে যেসব শর্ত পূরণের প্রয়োজন, তা করা সম্ভব হয়নি। তবে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হচ্ছে, যাতে বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে ওই সব প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ছাড়া যায়।

জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার সচিব সৈয়দ আশফাকুজ্জামান বলেন, লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত না করে এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ছাড়া ঠিক হবে না। চাহিদা মেটাতে এলএনজি আমদানি হচ্ছে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে গ্যাসের দাম না বাড়ালে কোম্পানিগুলোর ওপর চাপ আরও বাড়বে। কাজেই শেয়ার ছাড়ার আগে এসব বিষয় বিবেচনা করতে হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক বিভাগের যুজ্ঞ্ম সচিব নাসির উদ্দিন আহমেদ আশা করছেন, বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে সংশ্নিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো শেয়ারবাজারে আসতে সক্ষম হবে। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির মুখপাত্র সাইফুর রহমান বলেন, আইপিওতে আসার জন্য যেসব শর্ত রয়েছে, তা প্রতিপালন করতে হবে। প্রচলিত নিয়মকানুন মেনে বাজারে এলে বিএসইসির পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে।

সরকারি কোম্পানি তিতাস গ্যাসের ২৫ শতাংশ শেয়ার ছাড়া হয়েছে অনেক আগেই। আরও ১০ শতাংশ ছাড়ার কথা ছিল, কিন্তু তা এখনও হয়নি। এ ছাড়া পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির ২০ শতাংশ শেয়ার ছাড়া হলেও আরও ১৫ শতাংশ ছাড়ার প্রস্তাব ঝুলে রয়েছে। বিদ্যুৎ খাতের অন্য তিনটি আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেড ও ইলেকট্রিসিটি জেনারেশন কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেডের শেয়ার ছাড়ার কার্যক্রমে তেমন অগ্রগতি নেই।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতায় প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ, চিটাগং ডকইয়ার্ড, কর্ণফুলী পেপার মিলস লিমিটেড, বাংলাদেশ ইন্স্যুলেটর অ্যান্ড স্যানিটারি ওয়্যার ফ্যাক্টরি লিমিটেডেরও একই অবস্থা। বেসামরিক বিমান মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ১০ শতাংশ শেয়ার ছাড়ার প্রক্রিয়া থমকে আছে বহু বছর ধরে। শেরাটন হোটেলের মাত্র ১ শতাংশ শেয়ার ছাড়া হলেও অবশিষ্ট শেয়ার বাজারে আসছে না। সোনারগাঁও হোটেলেরও একই অবস্থা। ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে টেলিটক, বাংলাদেশ কেবল শিল্প লিমিটেড ও টেলিফোন শিল্প সংস্থার শেয়ার ছাড়া কার্যক্রমেও কোনো অগ্রগতি নেই।

যোগাযোগ করা হলে পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবু আহমেদ সমকালকে বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার না ছাড়ার পেছনে আমলারাই বড় বাধা। পর্ষদে যারা আছেন, তারা নানাভাবে সুযোগ-সুবিধা নেন। পুঁজিবাজারে এলে জবাবদিহি করতে হবে। ফলে তাদের সুযোগ-সুবিধা কমে যাবে। এ জন্য বিরোধিতা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, সরকারি মালিকানাধীন ভালো কোম্পানির শেয়ার বাজারের গভীরতা বাড়াবে। বিনিয়োগকারীরা উপকৃত হবেন। তবে লোকসানি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার না ছাড়ার পরামর্শ দেন তিনি।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক সভাপতি রকিবুর রহমান মনে করেন, সরকারি মালিকানাধীন এসব প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগ ব্যবস্থাপনা ভালো নয়। ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা না বাড়িয়ে আইপিওতে আনা ঠিক হবে না বলে মনে করেন তিনি।

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

nine + nineteen =