মানুষের চিন্তাধারা ও ভাবনা-কল্পনার পরিধি আগের তুলনায় অনেক পরিব্যাপ্তি লাভ করেছে। সার্বিক নিয়ম-নীতির প্রভূত উন্নয়ন সাধিত হয়েছে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, মানুষ আগেকার যুগের মতো এখনো পশ্চাদ্মুখিতা ও অধঃপতনের কৃষ্ণগহ্বরে দিশাহীন ঘুরপাক খাচ্ছে। কেউ যদি পৃথিবীর বুকে এমন কোনো ভূখণ্ড কিংবা অঞ্চল খুঁজে বেড়ায়, যেখানে কারো অবৈধ হস্তক্ষেপের শিকার হওয়াবিহীন, অনৈতিক বাধ্যবাধকতা, জোর-জবরদস্তি ও বাধা-বিপত্তিতে আক্রান্ত হওয়া ছাড়া পুরোপুরি মানবাধিকার, মান-সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনভাবে জীবন যাপন করা যায়, তা হবে কল্পনাপ্রসূত, অসম্ভব ও অকল্পনীয় চিন্তাভাবনা।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে লাখ লাখ উদ্বাস্তু রয়েছে, যারা স্বাধীনতা নামক ‘সোনার হরিণে’র খোঁজে ভিনদেশে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। তারা স্বদেশের শাসকগোষ্ঠীর চিন্তা-আদর্শের বিরোধী কিংবা ভিন্ন ধর্মাবলম্বী হওয়ায় দেশান্তরিত হতে বাধ্য হয়েছে।

ইদানীং এমন কিছু উগ্র সংগঠনের গোড়াপত্তন হয়েছে, যেগুলো মানুষের মগজধোলাই করা ও জনপদে জনপদে ত্রাস-মহাত্রাস সৃষ্টির দায়িত্ব পালন করছে। তারা মানবতাকে সীমাহীন অত্যাচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার নজিরও প্রতিষ্ঠা করছে। এটুকুতেই শেষ নয়, বরং নিরপরাধ মানুষকে নির্যাতনের বিভিন্ন ধরনের অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ও অস্ত্র-সরঞ্জামেরও আবিষ্কার করেছে, যেগুলো সত্যিকার অর্থে জঘন্যতম অপরাধী, ভয়ংকর খুনি ও শীর্ষ পর্যায়ের সন্ত্রাসীদের শাস্তি প্রদানের জন্য ব্যবহৃত হয় না। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, এগুলো দিয়ে বরেণ্য রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, চিন্তাশীল মহল ও বয়োবৃদ্ধ বুদ্ধিদীপ্ত সমাজ ও নিরপরাধ জনগণ—এমনকি অবুঝ শিশু-কিশোরদেরও বিভিন্ন যন্ত্রণাকর ও মর্মন্তুদ শাস্তির সম্মুখীন করা হচ্ছে। রাসুল (সা.)-এর আগমনপূর্ব জাহেলি যুগে আরবের কোনো এক শাসক কিছু লোককে আগুনে জীবন্ত পুড়ে মেরেছিল।

সে থেকে স্বাভাবিকভাবে তার নামের সঙ্গে ‘অগ্নিদাহক’ উপাধি যোগ হয়ে গেছে। বলা হয়ে থাকে, প্রাচীনকাল থেকে অদ্যাবধি আরব ব-দ্বীপের ইতিহাসে (বর্ণনার সূত্রের ভিন্নতা সত্ত্বেও) শুধু দুজন এমন শাসক অতিবাহিত হয়েছে, যারা জীবিত মানুষকে জ্বালিয়ে মারার শাস্তি দিয়েছিল। কিন্তু এখনকার দিনে পৃথিবীতে কাউকে জ্বালিয়ে হত্যা করা কোনো আশ্চর্যজনক বিষয় তো নয়ই, বরং সাধারণ একটা মামুলি বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কারণ যেখানে মানবতা ও সভ্যতা সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়, সেখানে শরীরে আগুন ধরিয়ে দিয়ে কিংবা বোমা হামলায় দগ্ধ করে হত্যা করা বা ফালি ফালি করে কেটে হত্যা করা—আবার কিসের অত চিন্তাভাবনা ও কষ্টের বিষয়? (আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ মিয়ানমারে ব্যাপক হারে হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলমানকে আগুনে পুড়িয়ে এবং অবর্ণনীয় ও মর্মান্তিকভাবে হত্যা করা হচ্ছে। তাদের ঘরবাড়ি ও সহায়-সম্পত্তি জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যারা ‘জীব হত্যা মহাপাপ’ বলে ধ্বনি তোলে, তারাই এসব হিংস্র হত্যাযজ্ঞ ও মুসলিমনিধন চালাচ্ছে। )

আজকাল সংবাদমাধ্যমগুলোয় খুব স্বাভাবিকভাবে প্রচার করা হচ্ছে, ‘অমুক জায়গায় এতজন মানুষকে অগ্নিদগ্ধ করে হত্যা করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে নারী এবং শিশুও রয়েছে। ’ কিন্তু আশ্চর্যের কথা হলো—এ সংবাদ বিশ্বমোড়লদের মনে সামান্য পরিমাণও আঁচড় কাটে না। কারো বিবেকে একটুখানি খোঁচাও দেয় না। যদি যোগাযোগবিচ্ছিন্ন এবং অনুন্নত ও অপরিচিত কোনো অঞ্চলে এসব হামলা ও ট্র্যাজেডি সংঘটিত হতো, তাহলে একটা কথা ছিল। অথচ গ্লোবাল ভিলেজের এই যুগে পিঁপড়ার মতো গণহারে বনি আদম হত্যা করা হচ্ছে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের পাশবিক নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড চালিয়ে ‘তারা’ আনন্দে গদগদ করছে। তবু যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছে না বিশ্ববিবেক।

আগেরকার যুগে কেউ যদি কাউকে গালমন্দ করত অথবা কারো ব্যাপারে কেউ শ্রুতিকটু বাক্যালাপ করত, তখন তাকে ‘গালিবাজ’ বা ‘মন্দভাষী’ অথবা ‘অশ্লীলবাচক’ বলা হতো এবং এসব শব্দ তাদের জন্য সংক্ষিপ্ত পরিচায়ক হয়ে উঠত। কিন্তু হালে শুধু ব্যক্তিগতভাবে নয়, সামষ্টিকভাবে গালমন্দ করতে ও অশ্লীল ভাষায় তর্কযুদ্ধ করার জন্য ঘটা করে নিয়মমাফিক বৈঠকের আয়োজন করা হয়। আর এটাকে ‘ব্যক্তিস্বাধীনতা’ ও ‘মতপ্রকাশের অধিকারচর্চা’র পূর্ণাঙ্গ রূপ বিবেচনা করা হয়। আবার কিছু দুষ্ট লেখক এমন এমন বইপত্রও রচনা করছে, যেগুলোয় অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন ও বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গকে চরমভাবে কলঙ্কিত ও কলুষিত করা হয়েছে এবং সত্যিকার ইতিহাস অস্বীকার করা হয়েছে।

একটা সময় ছিল, যখন শক্তিধর অস্ত্রধারীকে মোকাবেলা করাটা অনেক বড় বীরত্ব ও শৌর্যবীর্যের কথা ছিল। নিঃসঙ্গ ও নিরস্ত্র ব্যক্তির ওপর হামলা করা চূড়ান্ত কাপুরুষতার প্রমাণ ছিল। কিন্তু কালের বিবর্তনে পরিস্থিতির রূপ পাল্টানো কী অদ্ভুত! কারো অজান্তে অকস্মাৎ হামলা করার জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি-পন্থা আবিষ্কার করা হয়েছে এবং সেগুলো কাজে লাগিয়ে হামলা করা অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তা-চতুরতা ও সচেতনতার আলামত ভাবা হচ্ছে। উপরন্তু নিরস্ত্র মুসলমানদের ওপর পৈশাচিক হামলা চালিয়ে নারকীয়ভাবে আনন্দ উদ্যাপন করা হচ্ছে। কী আশ্চর্য! হামলাকারী সভ্য ও সাধু মানুষগুলো (!) ওই ধরনের বর্বর হামলায় লিপ্ত হওয়ার দরুন লজ্জিত ও অনুতপ্ত হওয়া দূরের কথা—উল্টো প্রচণ্ড গর্ববোধ ও উল্লাসে ফেটে পড়ছে। যুগের এ ভৌতিক পরিবর্তন সভ্যতার প্রতি কেমন নির্মম পরিহাস! মানবতার প্রতি কী ধরনের বিরূপ আচরণ!

পোশাক-পরিচ্ছদ, ঘরবাড়ি, অফিস-আদালত, কর্মক্ষেত্র ও গাড়ি-ঘোড়া নির্বাচনে মানুষ আজ রুচিশীলতার বৈচিত্র্য ও সভ্যতার চমৎকারিত্বের পরিচয় দিচ্ছে এবং দিন দিন উন্নতিতে উৎকর্ষ সাধন করছে। কিন্তু যে পরিমাণ উন্নতি ও উৎকর্ষ লাভ করছে, সে পরিমাণ নিজের মানবিক গুণাবলি ও চারিত্র্য-মাধুর্য বিসর্জন দিতে বসেছে। এখন যে পরিমাণই চেষ্টা-প্রচেষ্টা করা হোক আর যত বিদ্যা-বুদ্ধি খরচ করা হোক, প্রবন্ধ-নিবন্ধ লেখা হোক এবং সেমিনার-সিম্পোজিয়াম ও কর্মশালার আয়োজন করা হোক, বিভিন্ন ধরনের আইন-কানুন প্রণয়ন করা হোক—সব অর্থহীন শূন্য হাঁড়ি ও অচল মুদ্রায় পরিণত হবে। নিত্য-নতুন যত ব্যবস্থাপনা হাতে নেওয়া হোক, সব কিছু মুখ আর কলমের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। ঠোঁট আর কাগজের গণ্ডি পেরিয়ে হৃদয়ে প্রভাব ফেলবে না।

বলতে ইচ্ছা করে, এখন মানুষ বিভিন্ন রোগ-বালাইয়ের ওপর কর্তৃত্ব পেয়েছে ঠিকই; কিন্তু স্বাধিকার অর্জনের রাজনৈতিক হীনমানসিকতা, অপরের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার হিংস্র প্রবণতা এবং চরম হঠকারিতা ও স্বেচ্ছাচারিতাগুলো এমন নিত্য-নতুন রোগ সৃষ্টি করছে, যেগুলো অনুধাবন ও অনুভব করার এবং দমন করার ক্ষেত্রে সব ‘চিকিৎসক’ সম্পূর্ণরূপে অপারগ।

অপরাধ শনাক্তকরণে ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্য নিরূপণে, এমনকি হৃদয়ের স্পন্দনধ্বনি শোনার ও অনুভূত হওয়ার যন্ত্রও আবিষ্কার হয়েছে। কিন্তু মানুষ নিজের দূরদর্শিতা, বিদ্যা-বুদ্ধি, বিচক্ষণতা ও সামগ্রিক সহজাত যোগ্যতা থেকে ও স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্যাবলি এবং মানবিক গুণাবলি থেকে বরাবরই বঞ্চিত হচ্ছে।

অতীতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সঙ্গে মানুষের সম্পৃক্ততা ছিল নিতান্ত কম, তাই তখনকার মানুষজন মন্দ কিছুতে লিপ্ত হলে বা খারাপ কোনো ট্র্যাজেডিতে সম্পৃক্ত হলে বলা হতো, ‘অজ্ঞতা ও নিরক্ষরতার করালগ্রাসে আক্রান্ত হওয়ার কারণে মানুষ বিভিন্ন অপরাধে জড়াচ্ছে। ’ কিন্তু জ্ঞান-বিজ্ঞান যত উৎকর্ষ লাভ করছে, অপরাধ, হত্যাযজ্ঞ ও মানবনিধনের ঘটনা তত বেড়ে চলছে। বর্তমানে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে এসে উপনীত হয়েছে যে শিক্ষিত শ্রেণির ব্যাপারে মানুষের মনে ভয় ও আশঙ্কা সমধিক কাজ করে! আধুনিক শিক্ষিত মহল আজ দিকে দিকে আতঙ্কের নাম। কারণ যারা শিক্ষিত ও সভ্য শ্রেণির সদস্য, যারা ‘কলম-কালি’র ধারক-বাহক, তারা আজ সভ্যতার মুখোশ পরে পৃথিবীতে শত বিশৃঙ্খলা-অরাজকতা ও ভয়াল পরিস্থিতি তৈরি, নিদারুণ অস্থিরতা-অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা বাঁধানোর নেপথ্যে অত্যন্ত সক্রিয়তার সঙ্গে গোপনে কাজ করে যাচ্ছে। তাদের বাহ্যিক রূপ প্রত্যক্ষভাবে সভ্য হলেও ভেতরকার মানবতা-প্রকৃতি অত্যন্ত অসভ্য, নোংরা ও কদর্যপূর্ণ।

ওয়াজেহ রশিদ হাসানি নদভি

লেখক : শিক্ষাসচিব, দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামা লখনউ, ভারত।

(ভারত থেকে প্রকাশিত আরবি ম্যাগাজিন ‘আল-বাহসুল ইসলামী’ থেকে অনুবাদ করেছেন মুহাম্মদ মিনহাজ উদ্দিন

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

thirteen − eight =