খালিদ আবু, পিরোজপুর: পিরোজপুর জেলার স্বরূপকাঠি উপজেলা সদর। এলাকার বেশিরভাগ মানুষের ঘুম ভাঙে বিরামহীন খুটখাট শব্দে। উপজেলার ১৫টি ডকইয়ার্ড থেকে ভেসে আসা এই শব্দ কাকডাকা ভোরে শুরু হয়ে চলে গভীর রাত পর্যন্ত। প্রথমবার কেউ স্বরূপকাঠি উপজেলায় এলে একটু অবাকই হবেন। কাঠ ব্যবসা, পেয়ারা ও নার্সারির জন্য বিখ্যাত স্বরূপকাঠি উপজেলার নদীর পারে বিভিন্ন স্থানে এখন দেখা যাবে নানা আকৃতির জাহাজ। কোনোটি পূর্ণাঙ্গ, আবার কোনোটি তৈরিতে ব্যস্ত শ্রমিকরা। উপজেলার নানা স্থানে নির্মিত হচ্ছে নতুন জাহাজ। এসব দৃশ্য অবাক করার মতোই। সংশ্লিষ্টদের মতে, পিরোজপুরের এ ডকইয়ার্ড শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে দেশের অর্থনীতিতে।স্বরূপকাঠি নদী ও খালবেষ্টিত বাণিজ্যসমৃদ্ধ এলাকা। এলাকার পণ্য পরিবহনে তাই প্রাচীনকাল থেকেই স্থানীয়রা নৌকার ওপর নির্ভরশীল। ব্রিটিশ আমল থেকেই এ উপজেলার সচ্ছল ব্যক্তিরা সুন্দরবনের কাঠ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তখন বড় বড় কাঠের নৌকায় সুন্দরবন থেকে কাঠ ও গোলপাতা আনতেন এলাকার মহাজনরা। ধীরে ধীরে কাঠের নৌকার পাশাপাশি ইঞ্জিনচালিত স্টিলের ট্রলার ব্যবহার শুরু হয় এখানে। এসব ট্রলার মেরামত ও নির্মাণের জন্য গড়ে ওঠে ছোট ছোট ডকইয়ার্ড। ব্যবসার সেই ধারাবাহিকতায় ব্যবসায়ী জয়নাল আবেদিনের (মহাজন) হাত ধরে সর্বপ্রথম ডকইয়ার্ড ব্যবসার গোড়াপত্তন ঘটে স্বরূপকাঠিতে। এর কিছুদিন পরে শিকলা খালের মোহনায় সোহাগদল গ্রামের মোসলেম আলী, সুটিয়াকাঠির নওয়াব নূর হোসেন, স্বরূপকাঠির সামসুল হক হাওলাদার ও হেমায়েত উদ্দিন ডকইয়ার্ড নির্মাণ করেন। এর পর থেকে উপজেলায় সম্ভাবনাময় এই শিল্পের প্রসার ঘটতে শুরু করে।

সময়ের ব্যবধানে এসব ডকইয়ার্ডেই এখন নির্মিত হচ্ছে লঞ্চ, কার্গো জাহাজ ও উন্নত মানের ট্রলারসহ নানা নৌযান। ডকইয়ার্ডগুলোতে উপজেলার বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান হচ্ছে। ডকইয়ার্ডগুলো রূপ নিয়েছে সম্ভাবনাময় শিল্পে। স্বরূপকাঠির বুক দিয়ে প্রবাহিত সন্ধ্যা নদীর তীর, সোহাগদল, কালীবাড়ী, বরইকাঠী, বালিহারী ও তারাবুনিয়া খালের তীরে গড়ে উঠেছে ছোট-বড় ১৫টির মতো ডকইয়ার্ড। এসব ডকইয়ার্ডে জাহাজ নির্মাণের বিভিন্ন ধাপ সেটিং, কাটিং, ওয়েল্ডিং, রঙের কাজে কর্মসংস্থান হয়েছে হাজারো মানুষের।নির্মাণ শিল্পে সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এসব ডকইয়ার্ডে এক টন থেকে শুরু করে ১২শ টন ধারণক্ষমতার কার্গো জাহাজ নির্মাণ করা হচ্ছে। এসব জাহাজের কোনো কোনোটির দৈর্ঘ্য ২০০ ফুট পর্যন্ত। বিভিন্ন ডকইয়ার্ডের জাহাজ নির্মাণকারী ঠিকাদার এবং নির্মিত জাহাজ-মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এসব ডকইয়ার্ডে এক হাজার টন ধারণক্ষমতার বড় জাহাজ নির্মাণ করতে সময় লাগে ছয় থেকে সাত মাস। আর একটি জাহাজ নির্মাণ করে ঠিকাদারদের লাভ হয় দেড় থেকে দুই লাখ টাকা। স্বরূপকাঠির ডকইয়ার্ড থেকে জাহাজ নির্মাণ করে সন্তুষ্ট মালিকরা। তাদের দাবি, ঢাকা বা অন্যান্য ডকইয়ার্ডে নির্মাণ না করে এখান থেকে একটি বড় জাহাজ নির্মাণ করলে তাদের ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা সাশ্রয় হবে।এসব ডকইয়ার্ডে শ্রমিকদের প্রতিদিনের মজুরি প্রকারভেদে ১৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত। ডকইয়ার্ড মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে প্রায় ৪০ বছর আগে এ উপজেলায় জাহাজ নির্মাণ শিল্পের সূচনা হয়। আগে বিষয়টি জেলার বাইরে তেমন কেউ না জানলেও বর্তমানে এখানে মানসম্পন্ন বড় বড় জাহাজ নির্মিত হওয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকার মানুষের কাছে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে স্বরূপকাঠি।দেশের নানা প্রান্ত থেকে এখানে জাহাজ-মালিকরা তাদের নৌযান নির্মাণ ও মেরামত করাতে আসছেন। জাহাজ নির্মাণ শিল্পকে কেন্দ্র করে এখানে গড়ে উঠেছে ওয়ার্কশপ, হার্ডওয়্যার, স্টিলপ্লেট, ওয়েল্ডিং রড ও রঙের কারখানাসহ নানা ছোট-বড় শিল্প। বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে এসব কারখানায়। ডকইয়ার্ড মালিকরা জানান, জাহাজ নির্মাণের কাঁচামাল আনা হয় ঢাকার পোস্তগোলা, চট্টগ্রামের ভাটিয়ারী, কুমিরা ও সীতাকু- থেকে। এ ছাড়া কিছু কাঁচামাল বিদেশ থেকেও আমদানি করা হয়ে থাকে।ডকইয়ার্ড মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আসাদুজ্জামান জানান, এ শিল্পে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে স্থানীয় বিপুল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এখানকার সম্ভাবনাময় জাহাজ নির্মাণ শিল্প আরও এগিয়ে যাবে।তারাবুনিয়া ডকইয়ার্ডের জাহাজ নির্মাণ ঠিকাদার মোমিন শেখ জানান, ১ হাজার টন ধারণ ক্ষমতার একটি জাহাজ নির্মাণ করতে ৭-৮ মাস সময় লাগে। সব খরচ বাদে তার ১ থেকে দেড় লাখ টাকা আয় হয়। বরিশাল সদরের সেটিং শ্রমিক সাব্বির ইসলাম জানান, ডকইয়ার্ডে দৈনিক ৪০০ টাকা মজুরিতে কাজ করে ভালোভাবেই দিন কাটছে তার। তবে এখানে দৈনিক ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি রয়েছে বিভিন্ন শ্রেণির শ্রমিকদের।নির্মাণ শ্রমিক মো. পারভেজ সেখ জানান, একসময় বেকার ছিলাম। ১০ বছর আগে প্রতিবেশী ফারুকের সহায়তায় স্বরূপকাঠি ডকইয়ার্ডে প্রথমে ১২০ টাকা বেতনে কাজ শুরু করি। বর্তমানে ৫শ টাকা দৈনিক মজুরি পাই।ডকইয়ার্ড মালিক সমিতির সম্পাদক মো. তৌফিকুল ইসলাম বলেন, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া, বরগুনা, পটুয়াখালী ও মাদারীপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এক শ্রেণির জাহাজ মালিক এখান থেকে নতুন জাহাজ নির্মাণ করে নিয়ে যান এবং এ সব ডকইয়ার্ডে মেরামত ও রঙের কাজ করান। তিনি আরও বলেন, উপজেলার সন্ধ্যা নদীর তীরে সরকারিভাবে ভূমি বন্দোবস্ত ও নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ পেলে এ শিল্পের আরও প্রসার ঘটানো সম্ভব হবে।ডকইয়ার্ড মালিক সমিতির সভাপতি মো. শহীদুল্লাহ জানান, ডকইয়ার্ড শিল্প মানুষের কর্মসংস্থানের একটি নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে। সরকারি বা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে সম্ভাবনাময় এ শিল্প বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।স্বরূপকাঠি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আবু সাঈদ জানান, এখানকার জাহাজ নির্মাণ শিল্প একটি সম্ভাবনাময় খাত। এখানে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। তবে এ উন্নতি কাক্সিক্ষত মাত্রার নয়। এখানে আরও বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে, যা ব্যক্তি পর্যায়ে সম্ভব নয়। সরকারিভাবে সহজ শর্তে ঋণদানের ব্যবস্থা হলে এ শিল্প আরও সম্ভাবনাময় হয়ে উঠবে।

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

2 × three =