শেখ হাসিনা

সরকারের জোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বিশ্ব জনমত সৃষ্টি হয়েছে : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আন্তর্জাতিক মহলে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে যে জনমত সৃষ্টি হয়েছে তা আওয়ামী লীগ সরকারের জোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টারই সাফল্য।

প্রধানমন্ত্রী আজ সংসদে তার জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে সরকারি দলের সদস্য মুহাম্মদ মিজানুর রহমানের এক প্রশ্নের জবাবে আরো বলেন, মিয়ানমারের নাগরিকদের স্বদেশে নিরাপদে ফিরে যাওয়ার বিষয়টি এখন আন্তর্জাতিকভাবে সবার প্রত্যাশা।

তিনি বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা বা আরাকানের মুসলমানদের ওপর পরিচালিত হত্যাযজ্ঞসহ পৃথিবীর সব জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডকে হার মানিয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, মিয়ানমারে পরিচালিত হত্যাযজ্ঞের পরিপ্রেক্ষিতে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত লাখো রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে মানবিক আশ্রয় প্রদানের ফলে বাংলাদেশের উদ্যোগ সারা বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে।

সরকার প্রধান বলেন, বাংলাদেশ সব সময় যেকোনো সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানে বিশ্বাসী। ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করেছিলেন, ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’ এবং ‘সব বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান হবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এরই ধারাবাহিকতায় মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দেয়া ছিল সরকারের একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। এ কারণে বাংলাদেশ আজ বিশ্ব নের্তৃবৃন্দের কণ্ঠে গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মানের সাথে উচ্চাতি হচ্ছে। সরকার এদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন নিশ্চিতসহ এ সংকটের স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে জোরালো কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

শেখ হাসিনা বলেন, চার দশক ধরে মিয়ানমারের সাথে অনিষ্পন্ন থাকা সমুদ্রসীমা নির্ধারণ সরকার আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ২০১২ সালে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধান করেছে। মিয়ানমারের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রেখে বিদ্যমান সমস্যার ক্ষেত্রেও সরকার দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক ও বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, চলতি বছর ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন ও মানবতা বিরোধী অপরাধ শুরু করার পর থেকেই বাংলাদেশ সোচ্চার হয়েছে। অতিদ্রুত বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলের নজরে আনা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অত্যাচার-নির্যাতনের সঠিক চিত্র তুলে ধরতে সহায়তা করা হয়েছে। অসহনীয় নির্যাতন এবং মানবতা বিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে বিশ্ব জনমত গঠন ও মিয়ানমারের উপর চাপ সৃষ্টির জন্য কূটনৈতিক কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিজ দেশে নাগরিক হিসেবে বসবাসের অধিকার এবং নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনের জোর প্রচেষ্টা চালানোর ফলে রোহিঙ্গাদের অধিকারের পক্ষে আজ বিশ্ব জনমত গঠিত হয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া সব রোহিঙ্গার নিরাপদ প্রত্যাবাসন এবং এ সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭২তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্ক পর্বের বক্তৃতায় আমি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সুনির্দিষ্ট পাঁচ দফা প্রস্তাবনা তুলে ধরেছি। পাঁচ দফার মধ্যে অন্যতম ছিল জোরপূর্বক বিতাড়িত সব রোহিঙ্গাকে নিজ দেশে দ্রুত প্রত্যাবর্তন। আমার এই সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনাকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘের সাধারণ বিতর্ক পর্ব ছাড়াও অন্য সব বহুপাক্ষিক, আঞ্চলিক ও দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে আমি রোহিঙ্গা সমস্যার ওপর বিশেষভাবে আলোকপাত করি।

শেখ হাসিনা বলেন, রোহিঙ্গাদের দুর্দশা দূর করতে মুসলিম বিশ্বের আরো জোরালো ও ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালনের লক্ষ্যে আমি ওআইসি ‘কনটাক্ট গ্রুপ’এর বৈঠকে ও সব মুসলিম নের্তৃবৃন্দকে আহ্বান জানিয়েছি। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ, নিরাপত্তা পরিষদ এবং জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের মাধ্যমে তারা এ বিষয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নিয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণকারী রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শুরু করার উদ্দেশে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অফিসের মন্ত্রী সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করেন। মিয়ানমারের মন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যকার বৈঠকে প্রত্যাবাসন বিষয়ে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার সূত্রপাত হয়। প্রত্যাবাসনের জন্য একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সম্পাদনের লক্ষ্যে বাংলাদেশ একটি খসড়া হস্তান্তর করে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার প্রস্তাবিত দ্বিপাক্ষিক চুক্তির বিভিন্ন দিক নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মিয়ানমার সফর করে এসেছেন। সেখানে তিনি মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সুচি এবং মিয়ানমারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে পৃথকভাবে বৈঠকে মিলিত হন। দু’পক্ষেই প্রত্যাবাসন চুক্তি দ্রুত সম্পাদন এবং চলতি বছর নভেম্বরের মধ্যে ‘জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ’ গঠনে সম্মত হয়েছে। এ বিষয়ে দু’দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ ও আলোচনা চলছে।

শেখ হাসিনা বলেন, জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনের দফতরের তিনটি প্রতিনিধিদল রোহিঙ্গাদের পরিদর্শন করে এ পর্যন্ত দুটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, এগুলো হলো ২০১৭ সালের ৩ ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত ‘ফ্লাশ রিপোর্ট’ এবং ২০১৭ সালের ১১ অক্টোবরে প্রকাশিত ‘অফিস অব দ্যা হাইকমিশনার ফর হিউম্যান রাইটস’ (ওএইচসিএইচআর)-এর র‌্যাপিড রেসপনস মিশনস রিপোর্ট। মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনের দপ্তরের রিপোর্টে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর ব্যাপক নির্যাতনের তথ্য উঠে এসেছে।

তিনি বলেন, জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিল গঠিত অনুসন্ধানী দল ‘ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন’ ইতোমধ্যে কক্সবাজার সফর করে আশ্রয় গ্রহণকারী রোহিঙ্গাদের অবস্থা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেছে। তারা মিয়ানমারে মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে বলে মত প্রকাশ করে। এছাড়া কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়টি আজ সবার দাবি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকেও সব রাষ্ট্র কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের পক্ষে মত প্রদান করছে এবং সুপারিশ বাস্তবায়নে পদক্ষেপ গ্রহণে মিয়ানমারকে আহ্বান জানিয়েছে।

শেখ হাসিনা বলেন, রোহিঙ্গাদের বাসস্থানের জন্য জাতিসংঘের অঙ্গ সংগঠনসমূহে ‘ইউএনএইচসিআরআই এবং আইওএম-এর সহায়তায় প্রায় এক লাখ ৪৫ হাজার পরিবারের অস্থায়ী শেল্টার নির্মাণের কাজ চলছে। আশ্রিত রোহিঙ্গাদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে আশ্রয় কেন্দ্রের এলাকায় স্বাস্থ্য কেন্দ্র নির্মাণ করে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে। এছাড়া, ছয় লাখ বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় নির্মাণের লক্ষ্যে উখিয়াতে সম্প্রতি তিন হাজার ৫শ’ একর জমি বরাদ্দ করা হয়েছে। আমরা ‘ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম (ডব্লিউএফপি)’ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তায় খাদ্যের ব্যবস্থা করেছি। রোহিঙ্গাদের সহায়তায় বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষও সচেষ্ট রয়েছে।

তিনি বলেন, ১৯৮৯ সালের পর ২০১৭ সালে ২ সেপ্টেম্বরে এবার প্রথম জাতিসংঘ মহাসচিব নিরাপত্তা পরিষদের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। গত এক দশকে প্রথমবারের মতো রোহিঙ্গা প্রশ্নে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ সর্বসম্মতিক্রমে ২০১৭ সালের ১৩ সেপ্টেম্বরে একটি বিবৃতি দিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১৭ সালের ১৬ অক্টোবরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাউন্সিলের পক্ষ থেকে মিয়ানমার বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এছাড়া গত ২০১৭ সালের ১৫ অক্টোবরে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠিত ইন্টারপার্লামেন্টারি ইউনিয়ন (আইপিইউ)-এর ১৩৭তম সভায় জরুরি বিষয় হিসেবে রোহিঙ্গা ইস্যুতে একটি প্রস্তাব গ্রহণ হয়।

শেখ হাসিনা বলেন, সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত ৬৩তম কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি কনফারেন্স (সিপিসি) সর্বসম্মতভাবে গৃহীত এক বিবৃতিতে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মানবিক সংকট সমাধানে আন্তজৃাতিক সম্প্রদায়কে জরুরি পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

Comments

comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seventeen + fourteen =