জ্ঞান, দক্ষতা, শিক্ষা, সচেতনতা থাকার পরও শুধুমাত্র একটি জিনিসের অভাবে অনেকেই জীবনে এগিয়ে যেতে পারেন না। আর সেটা হলো “আত্মবিশ্বাস।” আত্মবিশ্বাসের অভাব ও নেতিবাচক চিন্তার আধিক্য একজন মানুষের জীবনে সাফল্য অর্জনের পথে সবচাইতে বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। ‘আমাকে দেখতে কি ভালো দেখাচ্ছে?’ ‘আমি কি যথেষ্ট স্মার্ট?’ ‘আমি কি এই চাকরীর সাথে মানানসই?’- এমন ধরণের নেতিবাচক চিন্তাভাবনা আত্মবিশ্বাস হীনতার পরিচয় তুলে ধরে। অন্য কারোর সাথে নিজেকে প্রতি ক্ষেত্রে তুলনা করা কখনোই ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনে না। এমন ধরণের চিন্তাভাবনার ফলে একজন শুধুমাত্র নিজের নেতিবাচক দিকের প্রতিই আলোকপাত করে থাকেন। যার ফলাফল স্বরূপ অদূর ভবিষ্যতে তার আত্মবিশ্বাস একেবারেই নষ্ট হয়ে যায়।

এমন ধরণের নেতিবাচক চিন্তাভাবনা এবং অন্যের সাথে নিজের তুলনা করা শুরু হয় অনেকগুলো কারণে। এর মাঝে রয়েছে খোঁটা দেওয়া, অভাব, হতাশা, শিক্ষাক্ষেত্রে খারাপ ফলাফল, বেকারত্ব, একাকীত্ব এবং আরো নানান নেতিবাচক সমস্যা। এমন সকল সমস্যার সমাধান একদিনে তৈরি করা সম্ভব না হলেও আত্মবিশ্বাসের অভাবকে দূর করা সম্ভব নিজের মাঝে কিছু চিন্তার পরিবর্তন ও ছোটখাটো অভ্যাস তৈরি করতে পারলে।

নিজেকে মূল্যায়ন করুন

নিজের মাঝে আত্মবিশ্বাস তৈরি করার একদম প্রথম শর্ত হলো নিজেকে মূল্যায়ন করতে শেখা। হয়তো নিজেকে আপনি কখনোই সেভাবে মূল্যায়ন করেননি যেভাবে করা উচিৎ। নিজের প্রতি সবার আগে যত্নবান হতে হবে। অন্য কারোর উপরে নিজের মুল্যায়নের ভার না দিয়ে নিজেকে নিয়েই মূল্যায়ন করুন, সমর্থন করুন। যেভাবে প্রিয় মানুষের প্রশংসা আপনাকে আনন্দিত করে তোলে, ঠিক সেভাবেই নিজের প্রশংসা নিজেই করুন।

নিজেকে ক্ষমা করতে শিখুন

একটা কথা মনে রাখতে হবে- আপনি একজন মানুষ, কোন যন্ত্র বা রোবট নন। একজন মানুষের মাঝে বিবেক-বুদ্ধির পাশাপাশি আবেগ, অনুভূতিও কাজ করে। যার ফলে অনেক সময় অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে অনেক ভুল কাজ হয়ে যেতে পারে। এই কারণে নিজের প্রতি ক্ষোভ পুষে রাখাটা হবে বোকামি। বরং নিজেকে ক্ষমা করে, শুধরে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে সবসময়।

জীবন সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করুন এবং নিজেকে উৎসাহিত করুন

আপনার পেশা যেটাই হোক না কেন অথবা যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন, একটা ব্যাপার মাথায় রেখে চলতে হবে- আপনি পরিশ্রম করে টাকা উপার্জন করছে। এতে লজ্জিত হবার কিছু নেই। নিজের শ্রম দেওয়া, চেষ্টা করাটাই সবচাইতে বড় কথা। সেটা নিয়ে চিন্তিত হলে কখনোই ভালো ফলাফল দেখা দেবে না। বরঞ্চ, নিজের জীবন ও জীবনের সবকিছুর প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করতে পারলে আত্মবিশ্বাস জন্ম নেবে। যা অবশ্যই ইতিবাচক ফলাফল আনতে সাহায্য করবে।

নিজেকে অন্যের সাথে তুলনা করা বন্ধ করুন

এক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব অনেকখানি থাকে। ফেসবুক কিংবা ইন্সটাগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে সর্বদা অন্যের সাফল্য কাহিনী অথবা ভালো থাকার ছবি দেখে অনেকেই নিজের সাথে তার তুলনা করা শুরু করে দেয়। ‘তার কাছে অতো দামী মোবাইল আছে, আমার কাছে তো নেই’- এমন নেতিবাচক ও তুলনামূলক চিন্তাভাবনার ফলে নিজের মাঝে আত্মবিশ্বাস এর ঘাটতি দেখা দেওয়া শুরু করে। তাই নিজেকে ভার্চুয়াল জগৎ থেকে সরিয়ে নিয়ে বাস্তব জগতের প্রিয় মানুষদের সাথে সময় কাটানোর পরিকল্পনা করতে হবে।

নিজেকে সুস্থ রাখার চেষ্টা করুন

নিয়মিত শরীরচর্চা করার অভ্যাস করুন, স্বাস্থ্যকর খাবার খান এবং স্বাস্থ্যকর একটি জীবনযাপনের রুটিন তৈরি করে ফেলুন। অন্য কারোর জন্য নয়, বরং নিজের জন্যেই নিজেকে সুস্থ রাখা প্রয়োজনীয়। শারীরিক সুস্থতা অনেক বড় একটি ব্যাপার, যা একজনের মাঝে আত্মবিশ্বাস তৈরি করার ক্ষেত্রে অনেক বড় ভূমিকা পালন করে থাকে।

খুঁতখুঁতে হওয়া বাদ দিন

যে কোন কিছু নিয়েই কারোর খুঁতখুঁত করার স্বভাবকে বলা হয়ে থাকে ‘পারফেকশনিষ্ট‘ হওয়া। একদম সঠিকভাবে রান্না করা খাবার, সঠিকভাবে ইস্ত্রি করা জামা, সঠিকভাবে কোন লেখা তৈরি করা অথবা নিজেকে একদম ‘পারফেক্ট’ দেখানোর জন্য অনেকেই অনেক বেশী সময় ব্যয় করে ফেলেন। যদি কিঞ্চিৎ পরিমাণ সমস্যা দেখা দেয় তবেই নিজের মনের মধ্যে সমস্যা দেখা দেওয়া শুরু করে। আর সেখান থেকেই দেখা দেয় আত্মবিশ্বাস এর অভাব। তাই একদম পারফেকশনিষ্ট হবার অভ্যাস পরিত্যাগ করতে হবে।

সুন্দর ও সঠিকভাবে পোষাক পরিধান করুন

এমন নয় যে, পরিধানকৃত পোষাকটি অনেক বেশী দামী ও নামকরা ব্র্যান্ডের হতে হবে। আপনি যে ধরণের পোষাক পরিধান করে আরাম ও স্বাছন্দ্য বোধ করবেন তেমন পোষাক পরিধান করার চেষ্টা করবেন সবসময়। এতে করে নিজের মাঝে আত্মবিশ্বাস তৈরি হতে সাহায্য করে থাকে।

পরিবর্তনকে গ্রহণ করার মানসিকতা গড়ে তুলুন

প্রতিনিয়ত পৃথিবী বদলাচ্ছে। সাথে বদলাচ্ছে ফেলে আসা দিনের নিয়ম-কানুন, চিন্তা-ভাবনা, আচার-আচরণ, প্রযুক্তিতে পরিবর্তন আসছে। চাইলেও অনেক কিছুই পুরনো সময়ের মতো ধরে রাখা সম্ভব হবে না। নিজেকে তাই পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নেওয়া শিখতে হবে ও মানিয়ে নিতে হবে।

ইতিবাচক মনোভাবপূর্ণ মানুষের সাথে মেশার চেষ্টা করুন

সময় ও বয়সের সাথে সাথে একটা ব্যাপার সকলেই বুঝতে পারেন- জীবনে থাকা প্রতিটি মানুষ নিজের জন্য ও নিজের জীবনের জন্য ইতিবাচক ও উপকারী নন। তাই তাদের সাথেই মেশার ও চলার চেষ্টা করুন, যারা সবসময় ইতিবাচক মনোভাব ধারণ করেন, যাদের কাছ থেকে জীবনে অনেক কিছু জানার ও শেখার রয়েছে। যারা আপনার জীবনেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে সাহায্য করে থাকবে। বিষাক্ত ও নেতিবাচক মনোভাবপূর্ণ মানুষ যত কাছের ও প্রিয় হোক না কেন, তাদের কাছ থেকে নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে রাখা হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

অন্যকে সাহায্য করার চেষ্টা করুন

আপনি নিজে যে জিনিসগুলো ও ব্যাপারগুলো অন্যের কাছ থেকে আশা করেন, অন্যকে ঠিক সেই জিনিসগুলোই দেওয়ার চেষ্টা করুন। নিজের যতটুকু সামর্থ্য ও যোগ্যতা রয়েছে সেটা দিয়েই অন্যকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে যান। এতে করে হয়তো আপনি অনেক কিছু পাবেন না। তবে সামান্য একটা করমর্দন, বন্ধুত্বপূর্ণ কোলাকুলি, প্রিয় মানুষের মুখের হাসি, কারোর কাছ থেকে পাওয়া ধন্যবাদটুকুই আপনার আত্মবিশ্বাসের পালে হাওয়া এনে দিতে সাহায্য করবে অভাবনীয়ভাবে।

সূত্রCurejoy

ফাওজিয়া ফারহাত অনীকা

আরও পড়ুনঃ   প্রেমে পড়ার লক্ষণগুলো

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

ten − 10 =