তৌহিদুর রহমান ॥ মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক নেত্রী আউং সান সুচি রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে তার আগের কঠোর অবস্থান থেকে সরে গেছেন। তিনি আগের অবস্থান থেকে এখন নত হয়েছেন। সুচির বক্তব্যের পথ ধরে রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানের পথে পৌঁছানো সম্ভব। যদিও রাখাইনের রোহিঙ্গা নির্যাতন ও হত্যা নিয়ে বক্তব্যে তার কোন জোরালো অবস্থান উঠে আসেনি। মঙ্গলবার মিয়ানমারের নেত্রী আউং সান সুচির টেলিভিশনে দেয়া বক্তব্যের প্রেক্ষিতে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা তাদের প্রতিক্রিয়ায় এসব কথা বলেছেন।

মিয়ানমারের টেলিভিশনে মিয়ানমারের নেত্রী আউং সান সুচি সে দেশের জাতির উদ্দেশে এক বক্তব্য দেন। সুচি তার বক্তৃতায় রোহিঙ্গাদের যাচাই বাছাই করে ফিরিয়ে নেয়ার কথা বলেন। এছাড়া আনান কমিশন বাস্তবায়নের প্রত্যাশা করেন। সেখানের সকল সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপত্তার বিষয়ে জোর দেন তিনি। মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বেআইনী সহিংসতার নিন্দা জানান তিনি।

সুচির বক্তব্যের প্রেক্ষিতে মন্তব্য জানতে চাইলে সাবেক রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জমির জনকণ্ঠকে বলেন, মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক নেত্রী আউং সান সুচি বলেছেন রাখাইন প্রদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে। তিনি এটা এক প্রকার স্বীকার করে নিয়েছেন। এটা বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক। এছাড়া জাতিসংঘের মহাসচিব কোফি আনানের নেতৃত্বে যে আনান কমিশন গঠিত হয়েছে, সে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের কথা বলেছেন তিনি। আমরাও চাই আনান কমিশনের বাস্তবায়ন হোক। এখানে আমাদের উভয়ের প্রত্যাশার মধ্যে মিল রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সুচি যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার বাস্তবায়নের প্রত্যাশা করেই আমাদের এখানের রোহিঙ্গাদের দ্রুত নিবন্ধন করা প্রয়োজন। এখানে আসা রোহিঙ্গাদের নিবন্ধন দ্রুত বাস্তবায়ন করা হলে পরবর্তীতে নাগরিক যাচাই বাছাই প্রক্রিয়ার জন্য সহজ হবে। কেননা সুচি বলেছেন, তার দেশের নাগরিকরা এখানে থাকলে তাদের ফিরিয়ে নিতে রাজি তিনি। সে কারণেই নিবন্ধন প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করা উচিত আমাদের।

সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ড. ওয়ালিউর রহমান বলেন, মিয়ানমারের নেত্রী আউং সান সুচি তাঁর জাতির উদ্দেশে যে ভাষণ দিয়েছেন, সেটা আমাদের জন্য বহু প্রত্যাশিত ছিল। তার বক্তব্য আমরা সাদরে গ্রহণ করতে পারি। কেননা তার বক্তব্যে অনেক ইতিবাচক দিক উঠে এসেছে। এসব ইতিবাচক দিক ধরে সামনের দিকে এগুলে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, সুচি মানবতাবাদী নেত্রী। আমরা তাকে সার্বজনীন মানবাধিকারের প্রতীক বলে জানি। সে কারণেই তার বক্তৃতাকে আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত ওয়ালিউর রহমান বলেন, রাখাইনে যখন হাজারেরও বেশি নারী-পুরুষের মৃত্যু হয়েছে। তারা এদেশে পালিয়ে এসেছে। সারা বিশ্বের মানুষ এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সোচ্চার হয়েছে, ঠিক তখনই সুচি রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। তার বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে প্রমাণ করেছেন, তিনি সাহসী ও বুদ্ধিমতী। তবে তার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অন্য একটি বিষয় আমার মনে হয়েছে, রাখাইন এলাকায় যে ঘরবাড়ী পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ওখান থেকে মানুষ বিতাড়িত হয়েছে। সেখানে জাতিগত নিধন হয়েছে। এটা ঠিক মতো তিনি জানেন না। তার বক্তব্যে এই বিষয়টি উঠে আসেনি।

সুচির বক্তৃতার অন্যতম একটি দিক হলো কোফি আনান কমিশনের বাস্তবায়ন। তিনি বলেছেন, এই কমিশনের বাস্তবায়ন চান তিনি। আমরাও এই কমিশনের বাস্তবায়নের চাই। সারা বিশ্বের পক্ষ থেকেই বলা হয়েছে, এই কমিশনের বাস্তবায়নের প্রত্যাশা করছে বিশ্ববাসী। সুচির বক্তব্যের এটি অত্যন্ত একটি ইতিবাচক দিক বলে আমি মনে করি।

ওয়ালিউর রহমান বলেন, সুচি বলেছেন, তারা শান্তি চান। আমরাও শান্তি চাই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও শান্তির কথাই বলেছেন। আমরা কোন ধরনের সংঘাতে যেতে চাই না। তবে সুচির বক্তব্যের পথ ধরে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব বলে আমরা মনে করি।

কূটনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব) আবদুর রশীদ বলেন, মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক নেত্রী আউং সান সুচি তার কঠোর অবস্থান থেকে সরে গেছেন। তিনি আগের অবস্থান থেকে নত হয়েছেন। তার বক্তব্যের বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে সহিংস ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তদন্ত হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। এছাড়া সকল নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথাও বলেছেন। আমি বলব তার এসব বক্তব্য অত্যন্ত ইতিবাচক।

আব্দুর রশীদ বলেন, অবশ্য সুচি বক্তব্যে বলেছেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপে তিনি ভীত নন। এছাড়া নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে কোন শক্ত অবস্থানের কথা তিনি জানাননি। এর মাধ্যমে তিনি একটি ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করেছেন বলে মনে করছি।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক আবদুর রশীদ বলেন, সুচির বক্তব্যের মধ্যে অনেক ইতিবাচক দিক রয়েছে। এই বক্তব্য নিয়ে সামনের দিকে এগুলে উভয় দেশের জন্যই ভাল হবে বলে তিনি আশাপ্রকাশ করেন।

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

three × five =