হুটহাট করে ঠাণ্ডা, জ্বর, সর্দি-কাশি কিংবা পেট ব্যাথা ও মাথা ব্যাথা দেখা দেয় অনেক সময়। এই সমস্যাগুলো এতোটাই ঘনঘন দেখা দেয় যে, আমরা ধরেই নেই এই সমস্যাগুলো খুব স্বাভাবিক শারীরিক অসুস্থতা! কিন্তু ছোট হলেও কোন ধরণের শারীরিক অসুস্থতাই স্বাভাবিক নয় এবং কাম্য নয় এই ব্যাপারটি মাথায় রাখা জরুরি। সামান্য ঠাণ্ডা-জ্বর থেকেও অনেক সময় বড় ধরণের সমস্যা দেখা দিতে পারে। অথবা খুব জরুরি কোন কাজের মুহুর্তে হুট করে প্রচণ্ড মাথাব্যথা নিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে ভণ্ডুল হয়ে যেতে পারে সকল কাজ।

এই সকল অসুস্থতাকে এড়াতে চাইলে খুব বেশী কিছু করার প্রয়োজন নেই। শুধুমাত্র কিছু নিয়ম মেনে চলতে পারলেই সুস্থতা বজায় থাকবে দারুনভাবে। ডাক্তার ও বিশেষজ্ঞদের থেকে জেনে নিন এমন কিছু নিয়ম, যা সাহায্য করবে আপনাকে শারীরিকভাবে সুস্থ থাকতে।

হাতের স্পর্শ এড়িয়ে চলুন 

ইউনিভার্সিটি অফ অ্যারিজোয়ানা তাদের এক গবেষণায় পেয়েছে, ভাইরাস মূলত ছড়িয়ে থাকে অফিসে ভাইরাসে আক্রান্তকোন সহকর্মীর মাধ্যমে এবং ৫০ ভাগ ক্ষেত্রে যেকোন কিছুর উপরিভাগ বা পৃষ্ঠদেশ থেকে। বিশেষ করে লিফট, টাকা এইসব জিনিস স্পর্শ করার মাধ্যমে যা বহুলোকের সংস্পর্শে আসে। ডাক্তার এবং ‘আস্ক ডাক্তার নন্দি’ বইয়ের লেখক জানিয়েছেন, “সাধারণ ক্ষেত্রে হাত দিয়ে যে কোন কিছু স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকা উচিৎ। প্রয়োজনে কাপড় অথবা টিস্যুপেপার ব্যবহার করতে হবে।”

পরিমিত পরিমাণে পানি পান করা

দ্যা ওহাইয়ো ষ্টেট ইউনিভার্সিটি ওয়্যাক্সনার মেডিক্যাল সেন্টার এর ডাক্তার রিনি মিরান্ডা বলেন, “পানি পান করার ফলে শরীরের ভেতরে খুব চমৎকার কিছু ঘটে থাকে। পরিমিত পানি পানের ফলে শরীরের ভেতরে বিষাক্ত ও বর্জ্র পদার্থ সব বের হয়ে যায়।” তাই শারীরিক সুস্থতার জন্য প্রতিদিন অন্তত পক্ষে আট গ্লাস পরিমাণ পানি পান করা জরুরি।

পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমানো

অপরিমিত ঘুম শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। যার ফলে খুব সহজেই শরীরে ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়ে পরে। ডাক্তার মিরান্ডা জানান, “ঘুম শরীরের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। আমরা যখন ঘুমাই তখন আমাদের শরীর পুনরায় ঠিক হবার জন্য সময় পায়। যে কারণে একজন পূর্ণ বয়স্ক ব্যক্তির প্রতিদিন ৬-৮ ঘণ্টা ঘুমানো জরুরি।” 

মোবাইল ও ঘরের দরজার হাতল পরিষ্কার রাখা

সারাদিনে সবচাইতে বেশীবার ব্যবহার করা হয় নিজের মোবাইল ফোন। হাতে ধরা রাখা, কানে ধরে কথা বলার পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে রাখা হয়। এছাড়াও, ঘরের দরজার হাতল অনেক মানুষের হাতের সংস্পর্শে আসে। বিধায় এই দুইটি জিনিসে প্রচুর পরিমাণে জীবাণু থাকে। ডাক্তার নন্দি জানান, যখনই তার বাসার কেউ অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি সকল মোবাইল ফোন ও দরজার হাতল পরিষ্কার করে ফেলেন।

উষ্ণ পানি পান করা 

আগেই বলা হয়েছে শারীরিক সুস্থতার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করা জরুরি। কারণ এতে করে একই সাথে শরীর হাইড্রেটেড থাকে এবং শরীরের ভেতরের বর্জ্র্য পদার্থ বের হয়ে যায়। তবে কয়েকটি গবেষণা থেকে দেখা গেছে যে, কুসুম গরম পানি পান করার ফলে নাসিকা নালী দিয়ে মিউকাস এর ফ্লো বেশি হয়। যে কারণে সাইনাস এর সমস্যা কমে যায় অনেকখানি। ডাক্তার নন্দি উপদেশ দেন, কুসুম গরম পানি পান করার সময় কিছু পরিমাণে মধু ও তাজা লেবুর রসও যোগ করে নেওয়ার জন্য।

নিয়মিত গ্রিন টি পান করা

এক গবেষণা থেকে দেখা গেছে যে নিয়মিত গ্রিন টি পানের ফলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। ডাক্তার পালিন্সকি ওয়েড বলেন, “গ্রিন টি তে থাকা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমূহ জ্বর, সর্দি, কাশি ও অন্যান্য ঠাণ্ডার সমস্যা তৈরিকারী ভাইরাস এর বৃদ্ধিতে বাধা তৈরি করার জন্যে শরীরের কোষে প্রতিরক্ষা দেয়াল তৈরি করে থাকে।”

বাইরে বের হবার অভ্যাস গড়ে তোলা

সাধারণত ছুটি বা অবসরে আমরা বেশীরভাগ সময়ে কম্পিউটারের সামনে বসে থাকি। যা মোটেও স্বাস্থ্যসম্মত নয়। গরম অথবা শীতকাল হোক, বাইরে বের হয়ে একটু দৌড়ে নেওয়া অথবা কিছুদূর হেঁটে আসার ফলে শরীর অনেক সতেজ বোধ হয়। ডাক্তার নন্দি বলে যে, বাইরে বের হবার ফলে শরীর তার প্রয়োজনীয় ভিটামিন-ডি এবং তাজা বাতাস পেয়ে থাকে। এমনকি এক গবেষণা থেকে দেখা গেছে, গরম আবহাওয়ায় বাইরে বের হয়ে হাঁটলে বা দৌড়ালে শরীর তার প্রয়োজনীয় উপাদান সমূহ পেয়ে থাকে চারপাশ থেকে!

প্রচুর পরিমাণে সবজি গ্রহণ করা

প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসে প্রচুর পরিমাণে সবজি রাখার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। কারণ প্রাকৃতিক খাদ্য সবজীতে রয়েছে রোগ-প্রতিরোধকারী উপাদান সমূহ। ডাক্তার পালিন্সকি বলেন, “সবুজ সবজীতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-সি এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমূহ, যা শরীরে রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে থাকে।”

দই খাওয়ার অভ্যাস করা

আমাদের শরীরে অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এর পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে প্রোবায়োটিক সমূহের প্রয়োজন রয়েছে। যা মূলত পাওয়া যায় ফার্মেন্টেড বিভিন্ন খাদ্য উপাদান যেমন দই অথবা চীজ থেকে। কারণ এই সকল ফার্মেন্টেড খাদ্য উপাদান খাওয়ার ফলে অন্ত্র সুস্থ থাকে এবং অন্ত্রের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া সমূহ বিনষ্ট হয়ে যায়। পালিন্সকি বলেন, “সুস্থ অন্ত্র শরীরের ভেতরের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে থাকে যার ফলে যেকোন ধরণের ইনফেকশনের বিরুদ্ধে শরীর ভালো প্রতিরক্ষা গড়ে তুলতে পারে।”

নিয়মিত গার্গল করা

প্রাচীন সময়ের এই নিয়মটি এখনকার সময়ে আবারও ফিরে আসছে শারীরিক সুস্বাস্থ্যের খাতিরে। জাপানের এক গবেষণা থেকে দেখা গেছে যে নিয়মিতভাবে গার্গল করার ফলে Upper Respiratory Tract Infection হবার সম্ভবনা একেকবারেই কমে যায়।

অ্যাপল সাইডার ভিনেগার পান করা 

বিভিন্নভাবে শারীরিক সুস্থতার জন্যে অ্যাপল সাইডার ভিনেগার কাজ করা থাকে। যার মাঝে রয়েছে নাসিকা ও গলার ইনফেকশনকে প্রতিহত করা। কারণ এতে রয়েছে অ্যাসেটিক অ্যাসিড, যা জীবাণুর বৃদ্ধিকে প্রতিহত করে থাকে। এর সাথে অ্যাপল সাইডার ভিনেগারে থাকা পটাসিয়াম মিউকাস ঘন করতেও সাহায্য করে থাকে।

সূত্র: Reader’s Digest

ফাওজিয়া ফারহাত অনীকা

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

14 − 2 =