মিয়ানমারের নেত্রী আউং সান সু চির একটি পোট্রেট অক্সফোর্ডের একটি কলেজ থেকে গত বৃহস্পতিবার (২৮ সেপ্টেম্বর) অপসারণ করা হয়েছে। কলেজের প্রবেশপথের দেয়াল থেকে ছবিটি অপসারণ করে গুদামে রাখা হয়েছে। এই কলেজেই একসময় সু চি আন্ডার গ্রাজুয়েট ছাত্রী হিসেবে লেখাপড়া করেছেন। এই সেন্ট হিউজ কলেজে (St Hugh’s College) তিনি ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত ছাত্রী ছিলেন। তার পঠিত বিষয় ছিল পলিটিকস, ফিলোসফি এবং ইকোনমিকস্।

এই কলেজেই তিনি অনেক পরে তার ৬৭তম জন্মবার্ষিকী পালন করেন। ২০১২ সালে তাকে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি অনারারি ডক্টরেট প্রদান করে। তার সেই প্রিয় কলেজ থেকে এখন তার প্রতিকৃতি অপসারিত হলো। কলেজ কর্তৃপক্ষ এই ছবি অপসারণের আসল কারণটি তাদের বিবৃতিতে উল্লেখ না করলেও কারো বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে এর কারণ, রোহিঙ্গাদের উপর মিয়ানমারের সৈন্যদের বর্বর অত্যাচার, সরকারের এথনিক ক্লিনসিং নীতি এবং তাতে আউং সান সু চির সমর্থন দান। সারা বিশ্বে এই নন্দিত নারী এখন নিন্দিত।

কিন্তু কলেজ কর্তৃপক্ষের এই ছবি অপসারণেই বার্মা ক্যাম্পেইন ইউকে গ্রুপ সন্তুষ্ট হয়নি। তারা বলেছেন, রোহিঙ্গাদের বর্বর এথনিক ক্লিনসিং এবং সেনাবাহিনীর মানবতাবিরোধী অপরাধে সমর্থন দানের জন্যই যে সু চির ছবি কলেজের প্রবেশপথ থেকে সরানো হয়েছে কলেজ-কর্তৃপক্ষের বিজ্ঞপ্তিতে একথা পরিষ্কারভাবে বলা উচিত ছিল। তারা তা না করে অন্যায় করেছেন।

এই ছবিটির একটি ইতিহাস আছে। ১৯৯৭ সালে শিল্পী চেন ইয়ানিং ছবিটি আঁকেন। এটি সু চির ব্রিটিশ স্বামী এবং অক্সফোর্ডের শিক্ষাবিদ মাইকেল আরিসের কাছে ছিল। ১৯৯৯ সালে মাইকেল আরিসের মৃত্যু হয় এবং ছবিটি সেন্ট হিউজ কলেজ কর্তৃপক্ষ কলেজের প্রধান প্রবেশ পথের দেয়ালে স্থাপন করেন। দীর্ঘকাল পর সু চি যখন মিয়ানমারে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত, তখন অক্সফোর্ডের কলেজ থেকে ছবিটি অপসারিত হলো। একেই বলে ভাগ্যের পরিহাস।

মিয়ানমার থেকে সামরিক শাসন উচ্ছেদ এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য স্বাধীনতার স্থপতি আউং সান-কন্যা সু চি দীর্ঘকাল সামরিক জান্তার হাতে নির্যাতন বরণ করেছেন এবং কারাবন্দি ছিলেন। শান্তি ও মানবতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণের জন্য ১৯৯১ সালে তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে মানবতার পক্ষে সু চির সেই আগের অবস্থান আর নেই। ফলে তার নোবেল পুরস্কার প্রত্যাহার করে নেওয়ার জন্য দাবি উঠেছে এবং বিশ্বের কয়েক শ’ বুদ্ধিজীবী সেই দাবিতে কণ্ঠ মিলিয়েছেন।

১৯৯৭ সালে অক্সফোর্ড কাউন্সিল আউং সান সু চিকে ফ্রিডম অব দা সিটি পদক প্রদান করেছিল। মিয়ানমারের বর্বর গণহত্যার পর অক্সফোর্ড সিটি কাউন্সিল সেই পদক প্রত্যাহার করার জন্য আগামী সপ্তাহে বৈঠক ডেকেছেন। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি সু চিকে দিয়েছিল অনারারি ডক্টরেট। সেটা এখন পর্যন্ত প্রত্যাহার না করলেও গত সপ্তাহে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মিয়ানমারে মুসলিম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর হত্যাযজ্ঞ চালানোর তীব্র নিন্দা করেছেন এবং আউং সান-সু চিকে আর্তমানবতাকে রক্ষার কাজে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।

আউং সান সু চিকে আমার একবার দেখার সুযোগ হয়েছিল। সেটা বহুকাল আগের কথা। আমি তখন লন্ডনে বিবিসি রেডিও’র বাংলা বিভাগে কাজ করি। লন্ডনের স্ট্রান্ডে বুশ হাউসে তখন বিবিসি’র অবস্থান। বুশ হাউসের পাঁচ তলায় বিবিসি’র বাংলা বিভাগের পাশেই ছিল বার্মিজ বিভাগ। তাতে কাজ করতেন এক বার্মিজ মহিলা। তার সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল। এই মহিলার বন্ধু ছিলেন সু চি। বার্মার নিহত নেতা আউং সানের কন্যা হিসেবে সু চিকে তখন আমি নামে চিনি।

সু চি মাঝে মাঝে বুশ হাউসে তার বন্ধুর কাছে আসতেন। বন্ধুর সঙ্গে চা খেতেন বুশ হাউসের গ্রাউন্ড ফ্লোরে বিবিসি ক্লাবে বসে। একদিন সু চির বন্ধু আমাকে তাদের টেবিলে ডেকে নিলেন। সু চি এবং তার স্বামী মাইকেল আরিসের সঙ্গে পরিচয় হলো। কথাবার্তায় বুঝলাম মিয়ানমারে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে যারা লড়াই করে ক্ষমতা থেকে তাদের উচ্ছেদ করতে চান তিনি তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল নন। তিনি বারবার যুদ্ধ এবং গান্ধীর অহিংস-নীতির কথা বলছিলেন। তিনি সামরিক জান্তার হাতে নির্যাতন বরণে রাজি, কিন্তু কোনো ভায়োলেন্সে সমর্থন দিতে রাজি নন। আমার মনে হয়েছিল তিনি পশ্চিমা শক্তির পরামর্শে সামরিক জান্তার সঙ্গে একটা আপস রফা করে ক্ষমতায় শরিক হতে চান।

কিন্তু তখন এই কথাটা ভাবতে এবং প্রকাশ করতেও ভয় পাচ্ছিলাম। পশ্চিমা মিডিয়ায় তার ঢালাও প্রশংসা, পরে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি, সামরিক জান্তা দ্বারা দীর্ঘকাল কারা নির্যাতন ভোগ করা ইত্যাদি তার প্রতি আমার মনের সকল সন্দেহ দূর করে দিয়েছিল। তাকে এ যুগের শান্তি ও মানবতার একজন সংগ্রামী দূত হিসেবেই গ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু সামরিক জান্তার সঙ্গে আপস করে ক্ষমতায় বসে তিনি যে হঠাত্ ‘মাদাম ইয়াহিয়া’ সাজতে পারেন, এই ধারণা কখনো আমার মনে ছিল না।

এখন আউং সান সু চির ভূমিকা দেখে বহুকাল আগে লন্ডনের বিবিসি ক্লাবে তার সঙ্গে দেখা হওয়ার সময় তার কথাবার্তাগুলো আমার মনে পড়ছে। বাম ব্রিটিশ কলামিস্ট জন পিলজার একবার ফিলিপিনসে মার্কিন-তাঁবেদার ডিক্টেটর মার্কোসের বিরুদ্ধে গণআন্দোলনের সময় মিসেস আকিনোর রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে আবির্ভাবের মূল কারণটি বিশ্লেষণ করেছিলেন। ফিলিপিনসে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন মার্কিনবিরোধী রূপ নিচ্ছে এবং জনতা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি উচ্ছেদের দাবি জানাচ্ছে, এটা দেখে আমেরিকা মিসেস আকিনোর কাঁধে ভর করেন। মিসেস আকিনোর স্বামীকে মার্কোস হত্যা করায় তার প্রতি জনগণের সহানুভূতি ও সমর্থন ছিল। তার সুযোগ গ্রহণ করে আমেরিকা তাকে সমর্থন দেয়। ওয়াশিংটনের ইঙ্গিতে সামরিক বাহিনী মার্কোসের উপর সমর্থন প্রত্যাহার করে মিসেস আকিনোকে সমর্থন জানায়। তিনি ক্ষমতায় বসেন, ফিলিপিনসে মার্কিন আধিপত্য রক্ষা পায়। মিসেস আকিনো তার ক্ষমতায় থাকার মেয়াদ শেষে একজন জেনারেলকে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হওয়ার সুযোগ করে দিয়ে ক্ষমতা থেকে বিদায় নেন।

জন পিলজারের এই বিশ্লেষণটি মিয়ানমারে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে গণআন্দোলনের মাথায় বসে আউং সান সু চির ক্ষমতায় বসার ক্ষেত্রেও খাটে কিনা সেকথাই এখন আমি ভাবছি। যদি খাটে তাহলে বিস্মিত হব না। বাংলাদেশ ও মিয়ানমার ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী দেশ। কিন্তু রোহিঙ্গা সমস্যার ক্ষেত্রে দুই দেশের দুই নির্যাতিত নেত্রীর ভূমিকা বিস্ময়করভাবে বিপরীত। শান্তি ও মানবতার সেবায় নিবেদিত নির্যাতিত নারী হিসেবে নোবেল পুরস্কার জয়ী আউং সান সু চির বর্তমান ভূমিকা সারা বিশ্বকে হতচকিত করেছে। তার নোবেল পুরস্কার প্রত্যাহার করে নেওয়ার দাবি উঠেছে। অক্সফোর্ড সিটি কাউন্সিল তাকে যে ফ্রিডম অব দি সিটি পদক দিয়েছিল, তা প্রত্যাহারের জন্য বৈঠক ডেকেছে। অক্সফোর্ডের যে কলেজে সু চি ছাত্রী ছিলেন, তারা কলেজের দেয়াল থেকে তার প্রতিকৃতি সরিয়ে দিয়ে গুদামে নিক্ষেপ করেছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি ছোট উন্নয়নশীল দেশ হওয়া সত্ত্বেও আর্তমানবতার ডাকে সাড়া দিয়েছেন।

অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ একটি ছোট উন্নয়নশীল দেশ হওয়া সত্ত্বেও আর্ত মানবতার ডাকে সাড়া দিয়েছেন। দেশটির অর্থনীতির উপর গুরুতর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে জেনেও দশ লক্ষের মতো রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে বিশ্বময় প্রশংসা কুড়িয়েছেন। এই রোহিঙ্গা সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য তিনি তার জাতিসংঘ ভাষণে যে প্রস্তাব দিয়েছেন তা সকলের সমর্থন কুড়িয়েছে। তাকে খেতাব দেওয়া হয়েছে মাদার অব হিউম্যানিটি। আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল একাডেমিক প্রস্তাব দিয়েছেন, তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হোক। নোবেল পুরস্কার কমিটি যদি এই প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং এ বছর শেখ হাসিনাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেন, তাহলে একজন যোগ্য মানুষকেই পুরস্কারটি দেওয়া হবে।

কেবল সু চির ছবি সরিয়ে এবং আবেদন-নিবেদন জানিয়ে রোহিঙ্গাদের উপর বর্বর নির্যাতন বন্ধ করা যাবে না। বর্তমান ব্যবস্থাগুলো মিয়ানমারের উপর একটা আন্তর্জাতিক চাপ হিসেবে কাজ করবে মাত্র। এই চাপকে কার্যকর করতে হলে জাতিসংঘকে কঠোর ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে এবং চীন ও ভারতও যদি গণহত্যা বন্ধ করা এবং শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য মিয়ানমার সরকারের উপর তাদের প্রভাবকে কাজে লাগায়, তাহলে এই বর্বরতা অবশ্যই বন্ধ হবে।

বাংলাদেশের মানুষ হাসিনা সরকারের নেতৃত্বে রোহিঙ্গা সমস্যায় যে ভূমিকা রেখেছে, তা নিশ্চয়ই বিশ্ব শান্তি রক্ষা ও আর্তমানবতার সেবায় একটা উল্লেখযোগ্য অবদান হিসেবে ইতিহাসে স্থান পাবে। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের মানুষের কর্তব্য রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার সঙ্গে সমস্যাটির মোকাবিলা করা। সমস্যাটি নিয়ে কোনো দলীয় রাজনীতি না করা। যেকোনো বড় জাতীয় সংকটে বাংলাদেশের মানুষ যে একাত্তরের মতো একাট্টা হতে পারে, যেকোনো হুমকির মোকাবিলা করতে পারে, এখন আবার তা প্রমাণ করার সময় এসেছে।
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

3 × 5 =