দেশের ১২৬টি ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি), পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে গতকাল বৃহস্পতিবার ভোট গ্রহণ করা হয়েছে। বেশির ভাগ স্থানে শান্তিপূর্ণ ভোট গ্রহণ হলেও কয়েকটি জায়গায় বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ হয়েছে। জাল ভোট, ব্যালটে প্রকাশ্যে সিল মারা, সিল মারা ব্যালট ভোটারদের দেওয়া, ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা, এজেন্টদের বের করে দেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১৭টি ইউপির বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থীরা নির্বাচন বর্জন করেছেন।

এসব ইউপির মধ্যে কুমিল্লার তিন উপজেলার ১২টি, ভোলার চরফ্যাশনের ৩টি ও নোয়াখালী সদর উপজেলার ২টি ইউপি রয়েছে। এর আগে হুমকির অভিযোগে গত বুধবার রাতে নোয়াখালীর নোয়ান্নই ইউপিতে বিএনপির প্রার্থী ভোট বর্জন করেন।

স্থানীয় সরকারের যে ১২৬টিতে গতকাল নির্বাচন হয়েছে, এর মধ্যে ৩৭টি ইউপি ও ৬টি পৌরসভায় সাধারণ নির্বাচন হয়। অন্যগুলোতে বিভিন্ন পদে উপনির্বাচন ও পুনর্নির্বাচন হয়।

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ছয়টি পৌরসভার মধ্যে চারটিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা ও একটিতে বিএনপির প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। আওয়ামী লীগের বিজয়ী প্রার্থীরা হলেন ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায় মো. সাইফুর রহমান, দিনাজপুরের বিরলে সবুজার সিদ্দিক, পঞ্চগড়ের বোদায় ওয়াহিদুজ্জামান ও নাটোরের বনপাড়ায় কে এম জাকির হোসেন। রাজশাহীর বাঘা পৌরসভায় জিতেছেন বিএনপির প্রার্থী আবদুর রাজ্জাক। জামালপুরের বকশীগঞ্জ পৌরসভায় এগিয়ে রয়েছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মো. নজরুল ইসলাম।

আর ৩৭টি ইউপির মধ্যে ২১টিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা, দুটিতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহীরা, একটিতে বিএনপির প্রার্থী ও দুটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়লাভ করেছেন।

গতকাল বেলা একটায় কুমিল্লার নাঙ্গলকোট প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন ভোট বর্জন করা বিএনপির আটজন, জামায়াতে ইসলামী-সমর্থিত দুজন স্বতন্ত্র এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের একজন প্রার্থী। তাঁরা প্রায় অভিন্ন অভিযোগ করে বলেন, ভোটকেন্দ্র থেকে তাঁদের এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়েছে। ব্যালট পেপারে আগাম সিল মেরে রাখা হয়েছে। প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, রিটার্নিং কর্মকর্তা ও প্রশাসনের কেউ তাঁদের সহযোগিতা করেননি।

ভোট বর্জনকারী বিএনপির প্রার্থীরা হলেন আদ্রা দক্ষিণ ইউপির মোহাম্মদ মাইন উদ্দিন, আদ্রা উত্তরের মাহবুবা আক্তার, বটতলীর গোলাম মাওলা, দৌলখাঁড়ের মো. মোশাররফ হোসেন, জোড্ডা পূর্বের মো. শফিকুর রহমান চৌধুরী, জোড্ডা পশ্চিমের মো. শাহজাহান মজুমদার, রায়কোট উত্তরের মো. ইদ্রিস মিয়া ও রায়কোট দক্ষিণ ইউপির মো. নজরুল ইসলাম ভূঞা। জামায়াত-সমর্থিত প্রার্থী দুজন হলেন আদ্রা দক্ষিণের মো. সাইফুল্লাহ ও রায়কোট দক্ষিণের মো. মাহফুজুল আলম খন্দকার। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীরা হলেন আদ্রা দক্ষিণের মো. নাসির উদ্দিন, বটতলীর মাবুল হক ও দৌলখাঁড়ের আবদুর রহমান।

আরও পড়ুনঃ   আগামী বুধবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন উপলক্ষে আওয়ামী লীগের সংসদীয় বোর্ডের সভা

বেলা সোয়া দুইটার দিকে লাকসাম উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল কালামের পাশাপুর গ্রামে সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন তিন ইউপিতে দলটির প্রার্থীরা। তাঁরা হলেন বাকই দক্ষিণের আনোয়ার হোসেন, মুদাফরগঞ্জ দক্ষিণের মো. আবুল বাশার ও মুদাফরগঞ্জ উত্তরের শাহ আলম।

লালমাইয়ের বাকই উত্তর ইউপির বিএনপির প্রার্থী দেলোয়ার হোসেনভোট বর্জন করেন। দাউদকান্দির ইলিয়টগঞ্জ দক্ষিণ ইউপির বিএনপির প্রার্থী আনোয়ার হোসেন পাঁচটি কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর সমর্থকদের বিরুদ্ধে জোর করে সিল মারার অভিযোগ করেছেন। বারপাড়া ইউপির বিএনপির প্রার্থী মো. আলাউদ্দিন তিনটি কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর সমর্থকদের বিরুদ্ধে একই অভিযোগ তোলেন। এ ছাড়া দৌলতপুর ইউপির দক্ষিণ নারান্দিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের মাঠের পাশের বাঁশবাগান থেকে তিন বস্তা দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ।

কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক মিয়া বলেন, ‘এমন বিতিকিচ্ছিরি পরিবেশে কোনো নির্বাচন হয়েছে কি না জানা নেই। ভোটকেন্দ্রগুলোয় বহিরাগতদের আনাগোনা ছিল ব্যাপক। এত অনিয়ম আর কোনো নির্বাচনে চোখে পড়েনি।’

অবশ্য কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন বলেন, এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। নির্বাচন মোটামুটি সুষ্ঠু হয়েছে। বিএনপি শুধু অভিযোগ করে ভোটকেন্দ্রে থাকে না।

জানতে চাইলে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. খোরশেদ আলম বলেন, ‘কোনো ধরনের ঝামেলার খবর পাওয়া যায়নি। আমার কাছে কেন্দ্রের পরিস্থিতি নিয়ে কেউ অভিযোগ করেননি।’

ভোলার চরফ্যাশনে ভোট বর্জন করা বিএনপির প্রার্থীরা হলেন আমিনাবাদ ইউপির গোলাম আকতার, জিন্নাগড় ইউপির ইমরান ভূঁইয়া ও নীলকমল ইউপির নওরোজ বাবুল। দুপুর ১২টা থেকে বেলা ১টার মধ্যে তাঁরা ভোট বর্জন করেন। তাঁরা সংবাদ সম্মেলন করে অনিয়ম, কারচুপি, এজেন্ট বের করে দেওয়া, হাত থেকে কেড়ে নিয়ে ব্যালটে প্রকাশ্যে সিল মারার অভিযোগ করেন।

বিএনপির প্রার্থীদের ভোট বর্জনকে নাটক ও গতানুগতিক উল্লেখ করেছেন নীলকমল ইউপির আওয়ামী লীগের প্রার্থী আলমগীর হাওলাদার, জিন্নাগড়ের প্রার্থী মো. হোসেন ও আমিনাবাদের প্রার্থী মো. জামাল হোসেন। তাঁরা বলেন, বিএনপির এজেন্টরা পরাজয় দেখে বের হয়ে গেছেন।

আরও পড়ুনঃ   জোট নেতাদের বৈঠক ডেকেছেন খালেদা জিয়া

চরফ্যাশন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এনামুল হক বলেন, ‘ভোট শান্তিপূর্ণভাবে হয়েছে। কারচুপি, সিল মারা ও জাল ভোটের তেমন অভিযোগ পাইনি। বিভিন্ন স্থানে জাল ভোট দেওয়ার অপরাধে আটজনকে জেল-জরিমানা করা হয়েছে।’

নোয়াখালী সদর উপজেলার ধর্মপুর ও নোয়াখালী ইউপির ভোট বর্জন করেছে বিএনপি। এ ছাড়া ক্ষমতাসীন দলের হুমকিতে নেতা-কর্মী ও নির্বাচনী এজেন্টদের জীবন নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ার অভিযোগ তুলে বুধবাররাতে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান নোয়ান্নই ইউপির বিএনপির প্রার্থী তোফাজ্জল হোসেন।

সকাল আটটায় ভোট গ্রহণ শুরুর দুই ঘণ্টা না যেতেই ধর্মপুর ও নোয়াখালী ইউপিতে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন বিএনপির প্রার্থীরা। পরে তাঁরা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সদর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেন।

এ বিষয়ে সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শিহাব উদ্দিন বলেন, কোথাও বিএনপির এজেন্টকে বের করে দেওয়া হয়নি। কেউ যদি ব্যক্তিগত প্রয়োজনে কেন্দ্রের বাইরে যান, সে ক্ষেত্রে তো কিছু করার থাকে না।

রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সদর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. শাহজাহান বলেন, বিএনপির প্রার্থীদের কাছ থেকে কেন্দ্র দখল ও ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত করে কোনো সত্যতা মেলেনি।

লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার চর আলেক্সান্ডার ইউপি নির্বাচনে তিনটি কেন্দ্রের বাইরে প্রতিদ্বন্দ্বী সদস্য প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয়েছে। এ সময় বসতবাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট হয়েছে। এতে অন্তত ১১ নারীসহ ২৫ জন আহত হয়েছেন। জাল ভোট দেওয়ার অভিযোগে আটক করা তিন নারীসহ ১০ জনকে ভোট গ্রহণ শেষে বিকেল পাঁচটার দিকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

গতকাল সাধারণ নির্বাচন হওয়া পৌরসভাগুলো হলো পঞ্চগড়ের বোদা, নাটোরের বনপাড়া, ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা, জামালপুরের বকশীগঞ্জ, রাজশাহীর বাঘা ও দিনাজপুরের বিরল। এসব পৌরসভায় শান্তিপূর্ণ ভোট হয়েছে। শুধু জামালপুরের বকশীগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে মালিরচর হাজীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে জোর করে সিল মারায় কেন্দ্রটিতে ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে।

আরও পড়ুনঃ   সরকারের শেষ বছরে মন্ত্রিসভায় ব্যাপক রদবদল আনা হয়েছে

সাধারণ নির্বাচন হওয়া ৩৭টি ইউপির মধ্যে ১৫টি কুমিল্লায়। অন্যগুলো নাটোর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, চুয়াডাঙ্গা, ফরিদপুর, শরীয়তপুর, ভোলা, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, নীলফামারী, সাতক্ষীরা, সিরাজগঞ্জ, নড়াইল ও জামালপুরে।

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

thirteen − 5 =