মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে অপপ্রচারে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ জেল জরিমানার বিধান রেখে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের (আইসিটি) বহুল সমালোচিত ও ‘বিতর্কিত’ ৫৭ ধারা ছাড়াও আরো কয়েকটি ধারা বিলুপ্তি করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। এ আইনে ডিজিটালের সংজ্ঞা, ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব করা, ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম গঠন, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ১১ সদস্যের একটি ডিজিটাল নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠনের কথা বলা হয়েছে। তবে অপব্যবহার রোধে নতুন আইনে ৫৭ ধারাটি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়াও মন্ত্রিপরিষদ সভায় জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন-২০১৮ এবং সংবিধান সংশোধন প্রস্তাবের খসড়ায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

সোমবার প্রধানমন্ত্রীর তেজগাঁওয়ের কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিপরিষদ সভায় এ অনুমোদন দেয়া হয়।
পরে সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম এসব তথ্য জানান।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, এই আইনে কেউ যদি বেআইনিভাবে কারো ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে তাহলে তাকে সাত বছরের জেল ও ২৫ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড দেয়া হবে। বেআইনিভাবে অন্য সাইটে প্রবেশ করার পর যদি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে কেউ যদি ক্ষতিগ্রস্ত হন তবে ১৪ বছরের জেল ও এক কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড দেয়া হবে। আবার কেউ যদি বেআইনিভাবে কারো ডিভাইসে প্রবেশ করে তাহলে হবে এক বছরের জেল ও তিন লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড। আবার কেউ যদি কারো ডিভাইসে প্রবেশে সহায়তা করে তাহলে তাকে তিন বছরের জেল ও তিন লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ড দেওয়া হবে। তিনি বলেন, কেউ যদি কারো কম্পিউটারের সোর্স কোড পরিবর্তন বা ধ্বংস করে তাহলে তিন বছরের জেল ও তিন লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড দেয়ার বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া কেউ যদি ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কোনও ধরনের প্রপাগান্ডা চালায় তাহলে ১৪ বছরের জেল ও এক কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে আইনটিতে।

আরও পড়ুনঃ   পদ্মা সেতুর অগ্রগতি অর্ধেকেরও বেশি

শফিউল আলম বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়ার ৬২ ধারায় বলা হয়েছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন-২০০৬-এর ৫৪, ৫৫, ৫৬, ৫৭ ও ৬৬ ধারার বিলুপ্তি হবে। ৫৭ ধারায় সব ছোট করে লেখা ছিল। সেটা বিস্তারিত ব্রেক-আপ দিয়ে যেটা যে প্রকৃতির অপরাধ সেই আঙ্গিকে শাস্তি, বেশি হলে বেশি কম হলে কম শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। তদন্ত কীভাবে করা হবে সেটা ডিটেইল (বিস্তারিত) করা হয়েছে, যেটা আগে ছিল না। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় হওয়া মামলাগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেই মামলাগুলো চলতেই থাকবে, যেন ধারাটি বাতিল করা হয়নি।
কেন এই আইন করতে হলো- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলম বলেন, সাইবার ক্রাইমের আধিক্য এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মতো ঘটনা ঘটেছে। ফলে এ আইন করার প্রয়োজন হয়েছে। আগে সাইবার ক্রাইমের জন্য কোনো আইন ছিল না। এখন এই জাতীয় সব অপরাধের বিচার এই আইনের আওতাভুক্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, আইনে ডিজিটালের সংজ্ঞা, ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব করা, ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম গঠন, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ১১ সদস্যের একটি ডিজিটাল নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠনের কথা বলা হয়েছে। নতুন আইনের ১৭ থেকে ৩৮ ধারায় বিভিন্ন অপরাধ ও শাস্তির বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ১৭ ধারায় বলা হয়েছে, ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে কেউ যদি জনগণকে ভয়ভীতি দেখায় এবং রাষ্ট্রের ক্ষতি করে তাহলে ১৪ বছরের জেল ও এক কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড দেয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

২৫ ধারায় বলা হয়েছে, কেউ যদি ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল মাধ্যমে আক্রমণাত্মক ভয়ভীতি দেখায় তাহলে তাকে তিন বছরের জেল ও তিন লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। ২৮ ধারায় বলা হয়েছে, কেউ যদি ধর্মীয় বোধ ও অনুভূতিতে আঘাত করে তাহলে তাকে ১০ বছরের জেল ও ২০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড দেয়ার বিধান রাখা হয়েছে। ২৯ ধারায় বলা হয়েছে, কেউ মানহানিকর কোনো তথ্য দিলে তার বিরুদ্ধে তিন বছরের জেল ও পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ডে বিধান রাখা হয়েছে। ৩০ ধারায় বলা হয়েছে, না জানিয়ে কোনো ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস ব্যবহার করে ব্যাংক-বীমায় ই-ট্রানজেকশন করলে পাঁচ বছরের জেল ও পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ডের বিধান রাখা হয়েছে। ৩১ ধারায় বলা হয়েছে, ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে কেউ অরাজকতা সৃষ্টি করলে সাত বছরের জেল ও পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। ৩২ ধারায় বলা হয়েছে, সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কেউ যদি বেআইনিভাবে প্রবেশ করে কোনও ধরনের তথ্য উপাত্ত যে কোনও ধরনের ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রপাতি দিয়ে গোপনে রেকর্ড করে তাহলে সেটা গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ হবে। এর জন্য ১৪ বছরের জেল ও ২০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আইসিটি অ্যাক্টের ৫৭ ধারাটিই ডিজিটাল আইনের ৩২ ধারা হিসেবে ফিরে এলো কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘না’।

আরও পড়ুনঃ   দেশের প্রথম সরকারি বিশেষায়িত মাছ বাজার চালু হলো যাত্রাবাড়ীতে

ধর্মীয় অনুভূতির সংজ্ঞা কী হবে এমন প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন, পেনাল কোডে ধর্মীয় অনুভূতির যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে সেটা এখানে প্রযোজ্য হবে। ৫৪ (ক) ধারায় বলা হয়েছে, ১৭, ১৯, ২১, ২২, ২৩, ২৪, ২৬, ২৭, ২৮, ৩০, ৩১, ৩২ ও ৩৪ ধারার সব অপরাধ জামিন অযোগ্য। তবে ৫৪(খ) ধারায় বলা হয়েছে, ২০, ২৫, ২৯ এবং ৪৮ ধারার সব অপরাধ জামিনযোগ্য।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, এ আইনে কোথাও কোনও ধারায় সাংবাদিকদের টার্গেট করা হয়নি। ইতোমধ্যেই ৫৭ ধারার করা চলমান মামলাগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, অতীতের মামলাগুলো যথারীতি চলবে। তবে আদালতকে মনে করতে হবে এ সংক্রান্ত কোনও আইন নেই। তিনি যে রায় দেবেন সেটাই চূড়ান্ত।

দেশের বিভিন্ন স্থানে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার অপব্যবহার বিশেষ করে এ ধারায় সাংবাদিকদের নামে মামলার কারণে এ ধারাটির বিরুদ্ধে সমালোচনা ওঠে। ধারাটি বাতিলের দাবি ওঠে বিভিন্ন মহল থেকে। ২০১৬ সালের বছরের ২২ আগস্ট ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। তবে খসড়াটি আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আইনমন্ত্রীকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেছিলেন, যারা কনসার্ন স্টেক হোল্ডার তাদের নিয়ে বৈঠক করে এটাকে আরেকটু পরিশীলিত করবেন। এ প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে কয়েক দফা সভা করার পর গত বছরের ২৯ নভেম্বর এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় খসড়াটি চূড়ান্ত করা হয়। এর পরই খসড়াটি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভা বৈঠকে পাঠিয়েছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ।

৫৭ ধারার মামলাগুলোর কী হবে
মোহাম্মদ শফিউল আলম জানান, তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারাসহ পাঁচটি ধারা বাতিল হলেও এ ধারায় যে মামলাগুলো চলমান সেগুলো বাতিল হবে না। এসময় ৫৭ ধারায় করা চলমান মামলাগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে এমন প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন, অতীতের মামলাগুলো যথারীতি চলবে। তবে আদালতকে মনে করতে হবে এ সংক্রান্ত কোনও আইন নেই। তিনি যে রায় দেবেন সেটাই চূড়ান্ত।
গত কয়েক বছরে অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের বিরুদ্ধে নানা সময়ে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগ এনে ৫৭ ধারায় মামলা করা হয়েছে। এই আইনে ধর্মীয় অনুভূতির সংজ্ঞা কী হবে প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, পেনাল কোডে ধর্মীয় অনুভূতির যে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে সেটা এখানে প্রযোজ্য হবে।
সাইবার সিকিউরিটি ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরের দেয়া তথ্য মতে, ২০১৭ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত সারাদেশে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে দায়ের হওয়া ৭ শ’ ৪০টি মামলা রয়েছে, যার মধ্যে ৬০ শতাংশ মামলা রয়েছে ৫৭ ধারার। ২০১৩ সালে প্রথম ৩টি মামলা হওয়ার পর প্রতি বছর মামলার সংখ্যা বেড়েছে। ২০১৪ সালে সারাদেশে ৩৩টি মামলা হলেও ২০১৫ সালে এসে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫২। ২০১৬ সালে ৫৭ ধারায় দায়ের করা মামলার সংখ্যা ২৩৩টি, আর ২০১৭ সালের জুলাই পর্যন্ত এই ধারায় মামলা হয়েছে ৩১৯টি।

আরও পড়ুনঃ   এবার মমতাজের কী হবে?

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

5 × four =