এম.এ ওয়াদুদ মিয়া:

শরীয়তপুরে ছয় নারীর সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক করে তার ভিডিও নেটে ছেড়ে দেয়ার ঘটনায় ছাত্রলীগ নেতা আরিফ হাওলাদারের বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা হয়েছে।

১১ অক্টোবর শনিবার রাত সাড়ে আটটায় ভুক্তভোগী আছিয়া আক্তার ওরফে সুফিয়া নামে এক গৃহবধু বাদী হয়ে ভেদরগঞ্জ থানায় একটি ধর্ষণ মামলা দায়ের করেন।

মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, ভেদরগঞ্জ উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের ফেরাঙ্গীকান্দি গ্রামের মজিবর হাওলাদারের পুত্র আরিফ হোসেন হাওলাদার (২২) আছিয়া আক্তার ওরফে সুফিয়ার স্বামীর নিকটতম আত্মীয়। উভয়ের বাড়ি কাছাকাছি হওয়ায় মাঝে মধ্যেই আরিফ বিভিন্ন উসিলায় তার শ্বশুর বাড়ি আসতো। তার স্বামী বিদেশে যাওয়ার পর ২০১৭ সালের ১ মার্চ রাত আনুমানিক সাড়ে ১০টার দিকে আরিফ হঠাৎ তার ঘরে ঢুকে পড়ে এবং জড়িয়ে ধরে আপত্তিকর ভিডিও করতে থাকে। এক পর্যায়ে উক্ত ভিডিও নেটে ছেড়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। এ ব্যাপারে মামলার বাদী বলেন, মান সম্মানের ভয়ে এতদিন কাউকে কিছু বলিনি। এখন ভিডিওটি নেটে ছেড়ে দেয়ায় আমার সব শেষ হয়ে গেছে। আরিফ আমার মতো আরও অনেক মেয়ের জীবন নষ্ট করেছে। তার অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার জন্যই আমি মামলা করেছি।

ঘটনার বিবরণে আরও জানা যায়, শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আরিফ হাওলাদার বিভিন্ন ধরণের ভয়-ভীতি এবং প্রেমের ফাঁদে ফেলে ছয় নারীকে ধর্ষণ করে। ধর্ষণ করার সময় তা গোপনে ভিডিও করে রাখে। ওই ভিডিওকে নেটে ছেড়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়। যখন তারা টাকা দিতে অপারগতা স্বীকার করে তখন তাদের ভিডিওগুলো নেটে ছেড়ে দেয়। তারই ধারাবাহিকতায় গত ১৫ অক্টোবর থেকে বিভিন্ন সময়ে ধর্ষণের ওই ভিডিওগুলো স্থানীয়দের মোবাইলে ছড়িয়ে পড়ে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আরিফ হাওলাদার ভেদরগঞ্জ এম.এ রেজা ডিগ্রি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র। সে ২০১৫ সালে জুন মাসে নারায়ণপুর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পায়। এক ভুক্তভোগীর স্বজন এবং কয়েকজন এলাকাবাসী জানায়, গোসলখানায় গোপনে ভিডিও ক্যামেরা লাগিয়ে প্রথমে এক গৃহবধূর ভিডিও ধারণ করেন আরিফ। পরে ওই ভিডিও দেখিয়ে ফাঁদে ফেলে গৃহবধূকে ধর্ষণ করেন। সেই ধর্ষণের দৃশ্যও গোপনে ভিডিও করা হয়। সেই ভিডিও এখন ছড়িয়ে পড়েছে এলাকাবাসীর মোবাইলে মোবাইলে। এভাবে ছয় নারীকে ফাঁদে ফেলে ধর্ষণ করেছেন আরিফ। ভুক্তভোগীদের মধ্যে একজন প্রবাসীর স্ত্রী যাকে এখন শ্বশুর বাড়ি থেকে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। অন্য এক গৃহবধূকে ধর্ষিতার অপবাদ দিয়ে গ্রাম ছাড়া করা হয়েছে।

এদিকে আরিফের প্রতারণার শিকার অপর এক কলেজছাত্রী কলেজে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। ভুক্তেভোগীদের স্বজনেরা বলেন, লোকলজ্জার ভয়ে তারা কোন মামলা করেননি। ঘটনার শিকার এক গৃহবধূর চাচাতো বোন বলেন, আরিফ আমার বোনকে ফাঁদে ফেলে ধর্ষণ এবং ওই ভিডিও ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে দফায় দফায় টাকা নিয়েছে। কিন্তু লোকলজ্জার ভয়ে আমরা কাউকে জানাতে পারিনি। ধর্ষণের শিকার হয়েছেন জানিয়ে এক কলেজছাত্রী বলেন, ‘আরিফ আমাকে শেষ করে দিয়েছে। আমি সমাজে মুখ দেখাব কী করে? মরে যাওয়া ছাড়া আমার কোন পথ খোলা নেই। আমি যদি আত্মহত্যা করি তাহলে তার জন্য দায়ী থাকবে আরিফ হাওলাদার।’

অভিযোগের বিষয়ে ভেদরগঞ্জ উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুল ইসলাম সোহাগ বলেন, ’ঘটনা জানার পর আমরা ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলেছি। আরিফের বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নেব। এ ছাড়া প্রাথমিকভাবে আরিফকে সংগঠন থেকে বহিস্কার করা হয়েছে।’

নারায়নপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিন বলেন, ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর আরিফ পালিয়ে বেড়াচ্ছে। ঘটনাটি শরীয়তপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য নাহিম রাজ্জাক এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদেরকে জানানো হয়েছে। আরিফকে পেলে আমরা বিচারের মুখোমুখি করব।

এ ব্যাপারে শরীয়তপুরের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার থান্ডার খায়রুল হাসান বলেন, ছাত্রলীগ নেতা আরিফ হাওলাদারের বিরুদ্ধে একটি ধর্ষণ মামলা হয়েছে। পুলিশ আসামিকে গ্রেফতারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

Comments

comments

একটি উত্তর লিখুন

Please enter your comment!
Please enter your name here

three × three =